বৃষ্টি না থাকায় শেরপুরে কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। তবে এখনো পানিবন্দি রয়েছে অনেক মানুষ। অন্যদিকে পানি কমতে শুরু করায় ভেসে উঠছে ক্ষতির চিহ্ন। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার ও সুপেয় পানির সংকট। চার দিনের বন্যায় শেরপুরে এখন পর্যন্ত ১১জনের মৃত্যু হয়েছে। শেরপুর কৃষি বিভাগ বলছে, পৌনে দুই লাখ কৃষকের প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে এবারের বন্যায়। বন্যায় শেরপুরে ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা। তিন হাজার মাছের ঘের ভেসে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ত্রিশ কোটি টাকা। বন্যার কারণে জেলার ২৪২টি প্রাথমিক ও ৮৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শেরপুর জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলাতে পানি কমলেও, এখনো ঘরে পানি রয়েছে নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলায়। স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও বিভিন্ন দপ্তর। তবে সব জায়গায় নৌকা না থাকায়, ত্রাণ সরবরাহে দেরি হচ্ছে।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন,শেরপুর জেলার প্রায় সব নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে। পানি কমতে শুরু করেছে এতে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে পানি নেমে যাওয়ায় ক্ষতি পরিমাণও ভেসে উঠছে।

এদিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় অবিরাম বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত চারটি ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে। বন্যার পানি সরে না যাওয়ায় চারটি ইউনিয়নের ৭১টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সোমবার (৭ অক্টোবর) সারা দিন রোদ থাকলেও মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) সকাল থেকে ফের থেমে থেমে বৃষ্টি হয়। উপজেলায় উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল কলসপাড়, যোগানিয়া, মরিচপুরান ও রাজনগর ইউনিয়নের ৭১টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানি বাড়ার কারণে তিনটি ইউনিয়নের অধিকাংশেই রাস্তা উপচে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অধিকাংশ গ্রামের চারপাশ পানিতে ডুবে আছে।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভোগাই নদের পানি বিপৎসীমার ১৬০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে ও চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

স্থানীরা জানান, বন্যা দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট। উঁচু এলাকার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের রোগ। এরইমধ্যে হাসপাতালে রোগীর ভিড় বেড়েছে। এদের মধ্যে বৃদ্ধ ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

এদিকে,নালিতাবাড়ী পৌরসভা, পোড়াগাঁও, নয়াবিল, রামচন্দ্রকুড়া, রাজনগর, মরিচপুরান ও রুপনারায়নকুড়া ইউনিয়নের ঢলের পানি নেমে গেলেও এসব ইউনিয়নের আক্রান্ত গ্রামগুলোরও ক্ষতচিহ্ন ভেসে উঠছে। চেল্লাখালী ও ভোগাই নদীর বেড়িবাঁধ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। ভেঙে গেছে কাঁচাপাকা সড়ক। ধসে পড়ছে শতশত পরিবারের মাটির দেয়াল। ভেসে গেছে শতশত পুকুরের মাছ। কিছু পরিবার সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তারা সাময়িকভাবে ত্রাণ সহায়তা পেলেও কিভাবে নতুন বাড়ি তৈরি বা মেরামত করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। তাই ভুক্তভোগীরা স্থায়ীভাবে আবাসন নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন।

নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানান, বর্তমানে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা করার জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। সরকারিভাবে এসব বানভাসিদের জন্য শুকনো খাবার ও বোতলজাত পানি বিতরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

অন্যদিকে মঙ্গলবার কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও ফুলপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) ভোর থেকে শুরু হয়ে সকাল সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত চলে মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এতে নতুন করে তিন উপজেলায় অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানান, মঙ্গলবার ভোর থেকে বৃষ্টি হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। বৃষ্টি বাড়লে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। বন্যার পানিতে ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের। জেলায় পানিবন্দি হয়ে আছেন অন্তত আড়াই লক্ষাধিক মানুষ।

এদিকে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরাঘাট নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্লাবিত হয় হালুয়াঘাট উপজেলা। মঙ্গলবার সকালে হালুয়াঘাটের ধারা, নড়াইল, বিলডোরা, ধুরাইল, আমতৈল, স্বদেশী ও শাকুয়াই ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়।

Haluagut pic

হালুয়াঘাটের ইউএনও এরশাদুল আহমেদ বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন তৎপর রয়েছে। পানিবন্দী মানুষকে শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ কার্যক্রম চলছে। সোমবার রাত থেকে পোড়াকান্দুলিয়া ইউনিয়নের পানি কমছে। কিন্তু মঙ্গলবার কিছু নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

ধোবাউড়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ১৬৪ গ্রামে মানুষ বন্যায় দুর্ভোগে পড়েছেন। উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ও ঘোষগাঁও ইউনিয়নে পানি কমতে শুরু করেছে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে উপজেলার গোয়াতলা, গামারীতলা ও ধোবাউড়া সদর এলাকায় পানি বাড়ছে। পোড়াকান্দুলিয়া ইউনিয়নে পানি স্থিতিশীল রয়েছে। কংস নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা ধোবাউড়া উপজেলার আইলাতলী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কয়েকটি ঘরে মঙ্গলবার সকালে পানি ওঠায় দুর্ভোগ বেড়েছে বাসিন্দাদের।

ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিশাত শারমিন জানান, পঞ্চম দিন মঙ্গলবার সকালের দিকে বৃষ্টি হওয়ায় পানি কিছুটা বেড়েছে, সেই সঙ্গে নতুন কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুটি ইউনিয়নে পানি আরো বৃদ্ধি পেয়ে নতুন করে কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। আমরা বানভাসি মানুষকে শুকনো খাবারের পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহ করছি। বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

অন্যদিকে, রোববার থেকে ফুলপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। শেরপুর থেকে নেমে আসা পানি মালিঝি ও কংস নদী হয়ে ফুলপুরের ছনধরা ইউনিয়ন দিয়ে প্রবেশ করে। সোমবার বিকেল থেকে ছনধরা ইউনিয়নে পানি কমতে শুরু করে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে ফুলপুর উপজেলার সিংহেশ্বর, ফুলপুর সদর ও বালিয়া ইউনিয়নের আজ নতুন করে ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে উপজেলাটিতে ৩৫ গ্রামে অন্তত ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে।

ফুলপুরের ইউএনও এ বি এম আরিফুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি খারাপের আশঙ্কা করা হচ্ছে। নতুন করে ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নতুন একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা, কাকনী, তারাকান্দা, ঢাকুয়া ইউনিয়নে বন্যার কারনে জলাবদ্ধতা কমেছে।

তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত মোটামুটি ভালো রয়েছি। এখানে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানান, মঙ্গলবার ভোর থেকে বৃষ্টি হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। এতে জেলার তিন উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। তিন উপজেলায় নগদ সাত লাখ টাকা ও ৬৩ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। বৃষ্টি না হলে পানি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ময়মনসিংহে বন্যার কারণে জেলায় মৎস্যখাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৭ হাজার ৮০ জন মৎস্যচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে ২১৭ লাখ, ভেসে গেছে ৫ হাজার ৬২৪ লাখ টাকার মাছ ও ১৪৯ লাখ টাকার রেনু পোনা।

ময়মনসিংহ কৃষি অফিসের তথ্যমতে, জেলার উপজেলাগুলোর মাঝে ধোবাউড়া উপজেলায় ১১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।হালুয়াঘাটে তলিয়ে গেছে ৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ধান এবং ৭৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত। ফুলপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৬৩০ হেক্টর ধান এবং ৬২ হেক্টর সবজি পানিতে তলিয়ে গেছে।