পদ্মা অববাহিকার একটি গ্রাম উদয়নগর। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামটিতে ৬৫টি পরিবার ছিল। ১৫ বছরে পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে গ্রামটির বেশির ভাগ নদীতে বিলীন হয়েছে। সেখানে এখন বাস করে মাত্র ২২টি পরিবার। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে এসব মানুষের অধিকাংশই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র। কেউ আশ্রয় নিয়েছে এলাকারই অন্য স্থানে। তাদের মধ্যে একটি অংশ সব হারিয়ে এখন দিনমজুর। বেশ কয়েক বছর ধরেই ভাঙনের কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে অসংখ্য আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার, শত শত একর আবাদি জমি ও ঘরবাড়ি। ভেঙেছে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, বিজিবি ক্যাম্প।
শুধু উদয়নগর নয়, কুষ্টিয়া সদর, মিরপুর, ভেড়ামারা ও দৌলতপুর উপজেলায় প্রতিদিনই পদ্মায় বিলীন হচ্ছে কোনো না কোনো স্থাপনা ও ফসলি জমি। বর্ষায় পানি বাড়লে ডুবে যায় এসব নিম্নাঞ্চল। আবার যখন পানি কমে, তখন দেখা দেয় নদীভাঙন। অব্যাহত ভাঙনে ক্রমেই বাড়ছে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্রের দাবি, ভাঙনে প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে কমপক্ষে ৬০-৭০ মিটার সমতল ভূমি। তবে সবচেয়ে বেশি ভাঙনের শিকার দৌলতপুর উপজেলা।
সরজমিনে উপজেলার উদয়নগর গ্রামে দেখা গেছে, আরো ৫০ মিটারের মতো নদী ভাঙলে এ অংশে থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে অচিরেই। সেখানকার বাসিন্দা হারুনুর রশীদ পাঁচবার ভাঙনের কবলে পড়েছেন। তিনবার বসতবাড়ির ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন। গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সেটিও দুই বছর হলো ভেঙে গেছে। ভাঙনের কবলে পড়ায় সরিয়ে নেয়া হচ্ছে উদয়নগর বিজিবি ক্যাম্পের পাশে থাকা আতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও।
কুষ্টিয়া বিজিবির ৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান বলেন, ‘উদয়নগর বিওপি থেকে ২৫-৩০ মিটার দূরে নদীর অবস্থান।’
দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড়-কোলদিয়াড় গ্রাম থেকে ভুরকাপাড়া-হাটখোলাপাড়া গ্রাম পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। হুমকির মুখে রয়েছে রায়টা-মহিষকুন্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। বাঁধটি ভাঙলে দৌলতপুরসহ কুষ্টিয়া অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এ অঞ্চলের জীবন-জীবিকা যেমন পদ্মার ওপর নির্ভরশীল। আবার পদ্মা প্রায় বিধ্বংসী হয়ে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের ঘরবাড়ি। পদ্মার পানির গতি-প্রকৃতিও পরিবর্তন হয়েছে। কয়েক বছর ধরে পানি বাড়লেই পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। এবার সর্বোচ্চ ছিল ১২ দশমিক ৩৮ সেন্টিমিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার। আবার শুষ্ক মৌসুমে থাকছে পানিশূন্য। পদ্মার গতি বদলের কারণে পাল্টে যাচ্ছে এ অঞ্চলের সমতল ভূপ্রকৃতিও।
পদ্মার অববাহিকায় রয়েছে ভেড়ামারা উপজেলার কিছু নিম্নাঞ্চল। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ভাঙনের মুখে পড়েছে। বাহিরচর ইউনিয়নের ১২ মাইল, মসলেমপুর ও মুন্সিপাড়ায় পদ্মার ভাঙন বেশ কয়েক বছর ধরেই তীব্র। উপজেলার সাহেবনগর এলাকায় কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়ক থেকে নদী এখন মাত্র ৪০ মিটার দূরে। সম্প্রতি ভাঙনে বিলীন হয়েছে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের কয়েকটি টাওয়ার।
সরজমিনে দেখা গেছে, মিরপুর উপজেলার বহলবাড়ীয়া ইউনিয়নের সাহেবনগর ও বারুইপাড়া ইউনিয়নের সাতটি গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়েছে। বহলবাড়িয়া, সাহেব নগর গ্রামে আরো অন্তত ছয়টি বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত এক মাসে নদীতে বিলীন হয়েছে কয়েকশ হেক্টর ফসলি জমি। হুমকির মুখে পড়েছে বসতবাড়ি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী জাতীয় মহাসড়ক, দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প ও ৪১০ মেগা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
পদ্মার ভাঙনের কারণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা রকম ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, নদীভাঙন আবহমান কালের। তাদের পূর্ব পুরুষদের আমল থেকে এ ভাঙনের গল্প শুনে আসছেন তারা। অবশ্য কয়েক বছর ধরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পোর্ট নির্মাণে প্রায় ৫০০ মিটার গ্রোয়েন বাঁধ পদ্মা নদীর মূল প্রবাহ চ্যানেলের মধ্যে নির্মাণ হয়েছে। এ কারণে নদী তার গতিপথ হারিয়েছে। এতে নতুন গতিপথের সন্ধানেই পদ্মা আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।
সার্বিক বিষয়ে পাউবো কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কিছু কারণের আভাস রয়েছে আমাদের কাছে। ভাঙন রোধে এরই মধ্যে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। ভাঙনকবলিত কয়েকটি স্থান শনাক্ত করা হয়েছে। নদীতে এখন পানি বেশি। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হবে। সব প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দরপত্র আহ্বানসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যচুক্তি প্রক্রিয়াধীন।’










