আসন্ন ইরি-বোরো মৌসুম সামনে রেখে নাটোরের সিংড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে আটটি ভেজাল বীজ কারখানা। এসব কারখানা থেকে বীজ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক। বিভিন্ন নামে রঙচঙ প্যাকেটে ধান প্যাকেটজাত করে বীজ বিক্রি করছে একটি চক্র।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীজ প্রত্যয়ন অফিসের নজরদারির অভাবে অনৈতিক এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। এ চক্রকে সব ধরনের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে মানহীন বীজ উৎপাদন করলেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে কৃষকদের মান ঘোষিত ট্রুথফুল লেভেল সিডস (টিএলএস) বীজ উৎপাদনের অনুমোদন বা লাইসেন্স দেয়া হয়। কিন্তু একটি চক্র প্রতি বছর ইরি-বোরো মৌসুম সামনে রেখে ভেজাল বীজ উৎপাদনে নামে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে চলনবিলের সিংড়ায় মানহীন বীজ উৎপাদন করছে অন্তত আটটি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে তারা বীজ উৎপাদন করছে। মানহীন বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে মেসার্স কৃষক ভাই বীজ ভাণ্ডার, গাজীপুর সিড লিমিটেড, স্কয়ার সিড কোম্পানি, গ্রিন সুপার সিডস, লর্ডস ইন্টারন্যাশনাল সিডস, সরকার সিডস লিমিটেড, গোল্ডেন সিড ও শেখ সিড। এসব প্রতিষ্ঠান বিআর-২৮, বিআর-২৯, বিআর-৫০ ধানসহ রোপা আমন জাতের বীজ উৎপাদন করে।

অভিযোগ রয়েছে, খোলাবাজার থেকে ধান কিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বীজের গুণগত মান যাচাই-বাছাই না করেই প্যাকেটজাত করে তারা। স্থানীয় বাজারে এসব বীজ বিক্রি না করে তারা দূরের অন্তত ২০টি জেলায় এসব বীজ সরবরাহ করছে। এতে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কৃষক।

সরেজমিন সিংড়ার পৌর শহরের বালুয়া বাসুয়া চলনবিল গেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাইরে কৃষক ভাই বীজ ভাণ্ডারের সাইনবোর্ড থাকলেও ভেতরে বিশ্বাস সিডস নামে বিআর-২৮ ধান প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। কোনো রকম গ্রেডিং, আর্দ্রতা বা বীজ অঙ্কুরোদ্গমের ক্ষমতা মাপের যন্ত্রপাতিও নেই তাদের কাছে। ছোট একটি কুঁড়েঘরে টেবিল ফ্যান দিয়ে ধান উড়িয়ে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। তাছাড়া সরকার অনুমোদিত একই নম্বরের একাধিক ট্যাগ কার্ড লাগানো প্যাকেটও চোখে পড়ে।

এ সময় মেসার্স কৃষক ভাই বীজ ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. আতিকুর রহমান জানান, নিজস্ব কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে এসব বীজ প্যাকেটিং করছেন। এর জন্য কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা কারো অনুমতির প্রয়োজন নেই। তার বীজের ব্যাপক সুনাম রয়েছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, মেসার্স কৃষক ভাই বীজ ভাণ্ডার খোলাবাজার থেকে ধান কিনে ট্রাকে করে রাতের আঁধারে এনে প্যাকেটজাত করে উত্তারাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে।

সিংড়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও নাটোর জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান মিজান বলেন, চলনবিলে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে বীজ প্যাকেটিং করা হচ্ছে। এতে প্রতি বছরই ভেজাল বীজ কিনে অনেক কৃষকই প্রতারিত হচ্ছেন। আর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও মনিটরিংয়ের অভাবে দিন দিন হাটবাজারগুলো ভেজাল বীজে ছেয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকির এখতিয়ার আমাদের নেই। আর এ উপজেলায় বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আমার জানা নেই। কারণ যারা বীজ উৎপাদন করছে তারা কৃষি অফিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না। এদের দেখভালের জন্য বীজ প্রত্যয়ন অফিস রয়েছে। তারাই এদের মনিটরিং করবে।

অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, মান ঘোষিত বীজ উৎপাদনে উৎপাদকের সব দায়দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়। এখানে বীজ প্রত্যয়ন অফিসের কোনো দায় নেই। তবে আমরা বাজার মনিটরিং করি। তাছাড়া আমার জনবল সংকট রয়েছে। তার পরও কৃষক ভাই বীজ ভাণ্ডারের বীজ না দেখে তাদের বীজ উৎপাদন না করার জন্য বলা হয়েছে।