কোনো ফৌজদারি অপরাধে উসকানি না থাকলে বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ করা সংস্কৃতির সামগ্রিক বিকাশে ক্ষতিকর বলে মনে করে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)। প্রতিষ্ঠানটির মতে, প্রকাশনার মতো জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম চাপ বা হুমকির মুখে থাকলে দেশের সামগ্রিক সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশের স্বার্থে মুক্তচিন্তা ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার পরিসরে হস্তক্ষেপ না করার দায়িত্ব সরকারের ও সংশ্লিষ্ট সবার। রাজধানীর বাংলাবাজারে ইউপিএলের শোরুমে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ দাবি করে হামলা ও কর্মীদের হয়রানির অভিযোগের পর গতকাল এক বিবৃতিতে এ অবস্থান জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
ইউপিএল জানায়, সোমবার বিকালে কয়েকজন ব্যক্তি শোরুমে এসে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিপণন বন্ধের দাবি জানান। একপর্যায়ে শোরুমের শাটার নামিয়ে দিয়ে দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করা হয়। পরে তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটক রাখা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, শোরুমে আসা ব্যক্তিরা বইটিকে নিষিদ্ধ দাবি করলেও ইউপিএলের জানা অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ নয়। কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করা ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেয়ার বিষয় রয়েছে। সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে বইটি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে ইউপিএল।
ঘটনাটিকে জাতির জন্য ‘অত্যন্ত লজ্জার এবং দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেছে ইউপিএল। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট থেকে তাদের প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য ক্ষমা চাইতে বলা, কিছু পাণ্ডুলিপি প্রকাশে অসম্মতি জানালে সরকারি হেনস্তা এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে বই প্রকাশ না করার চাপের কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউপিএল জানায়, এসব চাপ যথাসম্ভব উপেক্ষা করেই তারা পেশাদার প্রকাশনার নীতি অনুসরণ করেছে। প্রতিটি পাণ্ডুলিপি স্বাধীন রিভিউয়ারদের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়। এ নীতির কারণেই কোনো সরকারের আমলেই চাপের মুখে বই সরিয়ে নেয়া হয় না। প্রকাশিত যেকোনো গ্রন্থের ক্ষেত্রে এটিই তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে বাংলাদেশ ও দেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে উল্লেখ করে ইউপিএল বলেছে, বাংলাদেশ সৃষ্টির এবং মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এ গ্রন্থে পাওয়া যায়। বইটি কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিয়মে নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
একই সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পে ‘গুণ্ডামির রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি উপলব্ধি করে রাষ্ট্র, সমাজ ও জ্ঞানচর্চার স্বার্থে যেকোনো অবৈধ তৎপরতা কঠোরভাবে দমনের আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রকাশনা সংস্থা ‘আদর্শ’। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, কোনো বই নিয়ে আইনগত আপত্তি থাকলে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত প্রচলিত আইন ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—ভয়ভীতি, চাপ বা বই বিক্রি বন্ধ করার অনানুষ্ঠানিক শর্তের মতো অগণতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে নয়।
আদর্শ জানায়, ২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় আদর্শ থেকে প্রকাশিত তিনটি বইকে কেন্দ্র করে আমাদের স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়নি। আমরা তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (বৃহত্তর অর্থে) এবং লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। আজও আমাদের সেই নীতিগত অবস্থান বদলায়নি। কোনো বইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া এক বিষয়; কিন্তু আইনত নিষিদ্ধ নয়, এমন কোনো বই প্রকাশ, বিক্রি বা পাঠে ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা অনানুষ্ঠানিক চাপের মাধ্যমে বাধা দেয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।










