সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোটের বিধান পুনর্বহালের প্রস্তাবও করেছে। বুধবার (১৫ জানুয়ারি) সংবিধান সংস্কার কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেন।
সংবিধান সংস্কার কমিশন দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট চালু করার জন্য সুপারিশ করেছে। এ দ্বিকক্ষে যাতে করে সবার প্রতিনিধিত্ব থাকে এবং একইসঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিম্নকক্ষ করতে এবং সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বে উচ্চকক্ষ তৈরি করার জন্য সুপারিশ করেছে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষ গঠিত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে। ৪০০ (চারশো) আসন নিয়ে নিম্নকক্ষ গঠিত হবে। ৩০০ জন সদস্য একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। আরো ১০০ জন নারী সদস্য সারা দেশের সকল জেলা থেকে এই মর্মে নির্ধারিত ১০০ নির্বাচনী এলাকা থেকে কেবল নারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করা হবে।
উচ্চকক্ষ নিয়ে সুপারিশে বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষ মোট ১০৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে; এর মধ্যে ১০০ জন সদস্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের সংখ্যানুপাতে নির্ধারিত হবেন। রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের মনোনয়নের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ জন প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে। এই ১০০ জন প্রার্থীর মধ্যে কমপক্ষে ৫ জন আইন দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে - সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করবে। অবশিষ্ট ৫টি আসন পূরণের জন্য রাষ্ট্রপতি নাগরিকদের মধ্য থেকে (যারা কোনো কক্ষেরই সদস্য ও রাজনৈতিক দলের সদস্য নন) প্রার্থী মনোনীত করবেন। কোনো রাজনৈতিক দলকে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্বের যোগ্য হতে হলে- জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে।উচ্চকক্ষের স্পিকার সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন।
কমিশন মনে করে, গত ১৬ বছর বাংলাদেশ যে একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের মোকাবিলা করেছে, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ক্ষমতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ছিল না। সে কারণে যাতে একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ ও নির্বাহী বিভাগের দুটি পদ—প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য কমিশন চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স হিসেবে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল নামে একটি সাংবিধানিক সংস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করেছে। সেই কমিশন থাকবেন রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, সংসদের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা, দুই কক্ষের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার যারা আসবেন বিরোধী দল থেকে এবং একজন থাকবেন যিনি অন্যান্য দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব করবেন।
সংস্কার কমিশন মনে করে প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হওয়ার ব্যবস্থা দরকার এবং সেই কারণে ৭০ অনুচ্ছেদ দ্বারা যেন প্রধানমন্ত্রী কেবলমাত্র সুরক্ষিত না হন, সেজন্য কমিশন তার কিছু সংস্কারের প্রস্তাব করেছে।
সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে যেভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বলা হয়, তার মধ্যে আসলে যে প্রজাতন্ত্রের কথা হয়, সেটার সঙ্গে তারা দ্বিমত পোষণ করেছে এবং কমিশন বলেছে, বাংলাদেশ পরিচিত হওয়া উচিত জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে। কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের সুস্পষ্ট কাঠামোর পরামর্শ দিয়েছে এবং সেক্ষেত্রে কমিশন মনে করে যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বাছাইয়ের দায়িত্বভার কোনো ব্যক্তি বা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকা ঠিক না, সেজন্য এটিকে কমিশন জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের ওপর অর্পণের পরামর্শ দিয়েছে।
কমিশন বিচারবিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করেছে। কমিশন বলছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সুগম করতে হলে এবং সবার কাছে পৌঁছে দিতে হলে কমিশন মনে করে বিচারবিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার৷ কমিশন সুপ্রিম কোর্টের একক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখেই দেশের সব বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বিভাগের মর্যাদা এবং এখতিয়ার-সম্পন্ন একটি একক স্থায়ী আসন প্রবর্তনের সুপারিশ করেছে।
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থাকা জরুরি, সেজন্য কমিশন স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে কমিশন। তারা জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে সমন্বয়ক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবও করেছে। এ ছাড়াও কমিশন মৌলিক অধিকারের আওতা সম্প্রসারণের কথা বলেছে এবং সেগুলোকে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষার জন্য একটি সমন্বিত একক সনদের সুপারিশ করেছে।
কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ সুপারিশ জমা দেয়ার সময় বলেন, কমিশন আশা করে সুপারিশগুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো এক ধরনের ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারবেন।










