প্রবাসী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ও প্রতারণা বন্ধ না করলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ‘কপালে শনির দশা আছে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি বলেন, অভিবাসন খাতে সিন্ডিকেট গড়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের সুযোগ আর দেয়া হবে না।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি) এবং রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) যৌথ উদ্যোগে অনলাইন কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট মডিউলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সিঙ্গাপুরে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে একজন অভিবাসীর কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। এ অর্থ সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ নেয় না, বরং কিছু প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত সোজা হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নুরুল হক বলেন, প্রবাসীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়কারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারিতে রেখেছে। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও যেসব এজেন্সি লাইসেন্স নবায়ন করছে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দেশের নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অভিবাসন খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া বিদেশে কর্মী পাঠানোর বিজ্ঞাপন দেয়া আইনবিরোধী। এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে বিএমইটিকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গিয়ে দরিদ্র অভিবাসীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন নুরুল হক। তিনি বলেন, দেশে প্রায় তিন হাজার রিক্রুটিং লাইসেন্স থাকলেও নিয়ম মেনে চললে চার থেকে পাঁচশর বেশি লাইসেন্স টিকবে না। ভুয়া ও অনিয়মে জড়িত এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, নতুন অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসীদের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি ও ক্ষতিপূরণ আদায় সহজ হবে। রামরুর এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, প্রায় ৫১ শতাংশ অভিবাসী কোনো না কোনো ধরনের প্রতারণার শিকার হন। ১৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেও বিদেশে যেতে পারেননি এবং ৩২ শতাংশ বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের মুখে পড়েছেন।

প্রবাসীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম বলেন, প্রতারণা রোধে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি অভিবাসীদেরও দালালচক্র সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ। তিনি বলেন, বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ আত্মসাৎ, প্রবাসীদের সম্পদ দখল এবং নিখোঁজ হওয়ার মতো অভিযোগই সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই অভিযোগ দাখিল ও তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

অনুষ্ঠানে বিএমইটির মহাপরিচালক জামিল আহমেদ জানান, নতুন অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রবাসীরা সরাসরি অভিযোগ করতে এবং অভিযোগের অগ্রগতি জানতে পারবেন। ২০২৫ সালে বিএমইটি ম্যানুয়ালি ৫০০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করে প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ে সহায়তা করেছে বলেও তিনি জানান।

বিএমইটি, রামরু ও সিসটেক ডিজিটাল লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে তৈরি অনলাইন কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট মডিউলটি দেশের সব জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস এবং বিএমইটির কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনবে। এর মাধ্যমে অভিযোগ দাখিল, তদন্ত, নিষ্পত্তি এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনে সম্পন্ন করা যাবে।