২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মাথায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে তার সরকারের সব উপদেষ্টার সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হবে। যদিও গত দেড় বছরে তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে সরকারের মেয়াদের প্রায় শেষের দিকে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের সব উপদেষ্টার সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায় এক বছরে বেশির ভাগ উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে। অবশ্য কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা না নেয়ার কারণে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়-সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী তার সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেননি।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ২০২৪ সালের জুন শেষে প্রধান উপদেষ্টার মোট সম্পদ ছিল ১৪ কোটি টাকা। এক বছর পর ২০২৫ সালের জুন শেষে এটি বেড়ে ১৫ কোটি ৬২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী বা মেয়াদি আমানত বৃদ্ধি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে শেয়ার পাওয়ার কারণে তার সম্পদ বেড়েছে। প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী ড. আফরোজী ইউনূসের মোট সম্পদ ২০২৪ সালে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ও তার স্ত্রীর সম্পদের তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের বাইরে খলিলুর রহমান ও তার স্ত্রীর ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫০ ডলারের সম্পদ ছিল এবং ২০২৫ সালেও এর পরিমাণ ছিল একই। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা হিসেবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পাশাপাশি ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশে থাকা তাদের সম্পদের পরিমাণ ২ লাখ বেড়ে ২২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সম্পদ ১৫ কোটি টাকা (২০২৪) থেকে বেড়ে ১৬ কোটি ২৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজের মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকায়। ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ ও জাতিসংঘে কর্মরত থাকাকালীন আয় থেকে কেনা ফ্ল্যাট বাবদ দেশের বাইরে তার ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।

সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদের সম্পদ ১০ কোটি ৬৫ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ১০ কোটি ৯৪ লাখ (২০২৫) হয়েছে। তার স্বামী হুমায়ুন কাদের চৌধুরীর সম্পদ ৭ কোটি ৩৫ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে।

গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি সম্পদ বেড়েছে শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের। ২০২৪ সালের জুনে তার কাছে থাকা মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯৮ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুনে তার সম্পদ আড়াই গুণের বেশি বেড়ে ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার কারণে তার সম্পদ বেড়েছে। তার স্ত্রী ড. সায়রা রহমান খানের সম্পদ ৫ কোটি ১৯ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে।

বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সম্পদ ২০২৫ সালের জুন শেষে ৯১ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে তার সম্পদ ছিল ৯১ কোটি ১০ লাখ টাকা।

অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে ২০২৪ সালে ৭ কোটি ১০ লাখ টাকার সম্পদ ছিল। ২০২৫ সালে তা সামান্য বেড়ে ৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সম্পদ ১ কোটি ৪৮ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে। তার স্ত্রী শীলা আহমেদের সম্পদ ২ কোটি (২০২৪) থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের কাছে ২০২৪ সালের জুন শেষে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকার সম্পদ ছিল। ২০২৫ সালের জুনে তা কিছুটা বেড়ে ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদ ২ কোটি ৬২ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে। খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারের কাছে ২০২৪ সালের জুনে ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকার সম্পদ ছিল, যা ২০২৫ সালের জুন শেষে বেড়ে ৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা হয়েছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরারের সম্পদ ৭ কোটি (২০২৪) থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে। তার স্ত্রী অধ্যাপক (অব.) তাসনিম আরেফা সিদ্দিকীর সম্পদ ৭ কোটি ৮২ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সম্পদ ৬ কোটি ৪৭ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে। তার স্ত্রী দিলরুবা কবিরের সম্পদ ৩ কোটি (২০২৪) থেকে বেড়ে ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সম্পদ ২ কোটি ২৬ লাখ (২০২৪) থেকে কমে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে। তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকের সম্পদ কিছুটা বেড়ে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজমের কাছে ২০২৪ সালের জুনে ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার সম্পদ ছিল। ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে ২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের সম্পদ ৩ কোটি ২৫ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে। তার স্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) রেহানা খানমের সম্পদ কিছুটা কমে ৩৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সম্পদ ৬ কোটি ২১ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে। তার স্বামী কেএম আসাদুজ্জামানের সম্পদ ২ কোটি ৮৮ লাখ (২০২৪) থেকে কমে ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের সম্পদ ৪ কোটি ৪৭ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা (২০২৫) হয়েছে। তার স্ত্রী ডা. রমা সাহার সম্পদ ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা (২০২৪) থেকে বেড়ে ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের সম্পদ ৮১ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ১ কোটি টাকা (২০২৫) হয়েছে। তার স্বামী এফ এম মজহারুল হকের সম্পদ কিছুটা বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সম্পদ ৮৮ লাখ (২০২৪) থেকে বেড়ে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে। তার স্ত্রী কামরুন্নেসা হাসিনার কাছে থাকা সম্পদের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে ১৪ লাখ টাকা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সম্পদ ১ কোটি ২৬ লাখ (২০২৪) থেকে কমে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সম্পদ ২ কোটি ২৭ লাখ (২০২৪) থেকে কমে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে। অবশ্য তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৩ কোটি টাকা হয়েছে।

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সম্পদ ২০২৫ সালের জুন শেষে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তার টিআইএন না থাকায় সে সময়ের সম্পদের তথ্য দেখানো হয়নি। আরেক সাবেক উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলমের সম্পদ ৪ লাখ ২০ হাজার (২০২৪) থেকে বেড়ে ১২ লাখ ৭৬ টাকায় (২০২৫) দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কিছু উপদেষ্টা তাদের লাল পাসপোর্ট সমর্পণ করেছেন, কেউ কেউ সরকারি বাসা ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এখন সব উপদেষ্টার সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এগুলো উৎসাহব্যঞ্জক, জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে নতুন চর্চা বলা যায়। পাশাপাশি যারা মন্ত্রী পদমর্যাদার দায়িত্বে ছিলেন আইন তাদের সবার জন্য সমান। ফলে কোনো অজুহাত এক্ষেত্রে খাটবে না। আমি কোনো সুবিধা গ্রহণ করিনি তার মানে এটা না যে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না। সম্পদের তথ্য প্রকাশ একটি উত্তম চর্চা এবং সবারই সেটি করা উচিত।’