আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের নির্বাচনী ইশতাহার তুলে ধরছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেল এক অনুষ্ঠানে নির্বাচনী ইশতাহারের পাঠ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলওয়াত করেন ওলামা দলের আহ্বায়ক। এরপর জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। এসময় সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালন করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৫ দিন আগে দলীয় ইশতাহার আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরে তারেক রহমান।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতাহার দেয় দলটি। এতে পাঁচটি অধ্যায়ের প্রথমে অধ্যায় ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার‘, দ্বিতীয়তে ‘বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, তৃতীয়তে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, চতুর্থতে স্থান পেয়েছে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং শেষ অধ্যায়ে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতির কথা তুলে ধরে বিএনপি।

বিএনপির ইশতাহারে যে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—

১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।

২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষিখাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।

৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।

৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা–উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠায়ো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।

৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যামে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী–খালখনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।

৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।

৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন, ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।

বিএনপি বলছে, এ ইশতাহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা—এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।

বিএনপি বলছে, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে। আইনের উর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে, সবার আগে বাংলাদেশ।