প্রতি বছরের মতো এবারো বছরের প্রথম দিন
(১ জানুয়ারি) উদযাপিত হবে বই উত্সব। বই উত্সবের মধ্য দিয়ে নতুন
বইয়ের ঘ্রাণ পাবে শিক্ষার্থীরা। এদিন সারা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের
শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ করবে সরকার। তবে সারা দেশের চেয়ে দেশের
পার্বত্য অঞ্চলের বই উত্সবের উচ্ছ্বাস অনেকটা বেশি। কারণ পাহাড়ে সাধারণ
পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা শিশুরাও
পাবে নিজ মাতৃভাষায় বই। তবে পাহাড়ের তিন ভাষাভাষী শিশুরা মাতৃভাষায় বই পেলেও
তঞ্চঙ্গ্যা, বম, ম্রো ও পাংখোয়াসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর শিশুরা
মাতৃভাষায় পড়া থেকে বঞ্চিত। বিশিষ্টজন-শিক্ষাবিদরাও পাহাড়ের সব
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিতের জন্য সরকারকে তাগাদা দিচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা শিক্ষার্থীদের
মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিকে প্রতি জনে দুটি
করে ১৫ হাজার ৮২০টি বই, প্রথম শ্রেণীতে প্রতি জনে
তিনটি করে ২২ হাজার ৪১৬টি বই,
দ্বিতীয়
শ্রেণীতে প্রতি জনে তিনটি করে ২২ হাজার ৬৩৫টি বই ও তৃতীয় শ্রেণীতে প্রতি জনে একটি
করে ৬ হাজার ৮৭৯টি বই বিতরণ করা হবে। মোট ২৯ হাজার ৮০৬ শিক্ষার্থী ৬৭ হাজার ৭৫০টি
মাতৃভাষার বই পাবে।
জেলা প্রাথমিক অফিস সূত্রে আরো জানা গেছে, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে সাধারণ শিক্ষায় রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ৮৯ হাজার ১৫০ জন
শিক্ষার্থী ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৫২৯টি বই পাবে। জেলায় বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০৭। তবে এনজিও,
কিন্ডারগার্টেন, পরীক্ষণ বিদ্যালয়সহ মোট প্রাথমিক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৬৪টিতে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাতৃভাষার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের এ উদ্যোগের ফল শুধু তিন জাতিগোষ্ঠীর
শিশুরাই পাচ্ছে। তবে দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাবে যারা পড়তে পারছে তারাও ভালোভাবে শিখতে
পারছে না। তাই শিক্ষকদেরও আরো প্রশিক্ষকের প্রয়োজন দরকার। অন্যদিকে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ছাড়াও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর
শিশুরাও মাতৃভাষায় পড়তে চায়।
রাঙ্গামাটির বিশিষ্টজন ও প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে মনে করেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি জাতিগোষ্ঠীর
সবাই সমান অধিকার ভোগের দাবিদার। সরকার কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুধু পাঁচ
জাতিগোষ্ঠীর ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার পর যে নিশ্চুপ রয়েছে, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। যেহেতু পার্বত্য
চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের জন্য চুক্তিতেও এখানকার জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষার অধিকার
নিশ্চিত করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে,
তাই তার যথাযথ
অনুসরণ সময়ের দাবি।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ও শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বণিক
বার্তাকে বলেন, ‘আদিবাসী শিশুদের জন্য
সরকার মাতৃভাষায় পাঠদানের উদ্যোগে নেয়ার বিষয়টি আমরা সানন্দে গ্রহণ করেছি। কিন্তু
সেটি যদি কেবল বই বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, তাহলে হওয়ার মতো কিছুই হবে না। পড়ানোর জন্য সবার আগে জানাশোনা ও প্রশিক্ষিত
শিক্ষক দরকার, না হলে এ উদ্যোগ কার্যকর
হবে না।’
এদিকে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও)
মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলার ৮৯
হাজার ১৫০ জন শিশু বই উত্সবের মধ্য দিয়ে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৫২৯টি নতুন বই পাবে। এছাড়া
চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ক্ষুদ্র
নৃগোষ্ঠীর ২৯ হাজার ৮০৬ জন শিশু ৬৬ হাজার ২৫০টি মাতৃভাষার বই পাবে। মূলত সরকার
২০১৭ সাল থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক দিচ্ছে। ক্রমান্বয়ে এখন তৃতীয় পর্যন্ত
শিশুরা মাতৃভাষায় বই পাচ্ছে। পাঁচটি মাতৃভাষায় বই দেয়া হলেও পাহাড়ে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা শিশুরা বই পাচ্ছে। অন্যান্য
যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুরা রয়েছে,
তাদের মাতৃভাষায়
পাঠদানে সরকারের ইতিবাচক ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরো জানান, এরই মধ্যে জেলার প্রতিটি
উপজেলায় বই পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে বই উত্সব সম্পন্ন করতে সার্বিক
প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আগামী ১ জানুয়ারি সারা দেশের সঙ্গে একযোগে রাঙ্গামাটিতে
জেলাতেও বই উত্সব হবে।










