দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর উচ্চ আদালতের রায়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা নিশ্চিত হয় রেলওয়ের স্টেশন মাস্টারদের। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনীহায় রেলের পক্ষ থেকে পাঠানো সংশোধিত বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনে সেটি শতভাগ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দীর্ঘ মামলার পর আদালতের রায়ে সুরাহা হওয়া বিষয়টি নিয়ে ফের মামলা ও কর্মী অসন্তোষের আশঙ্কা করছে রেলওয়ে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ আদালতে রায়ের পর রেলওয়ের পক্ষ থেকে রিভিউ আবেদন করা হলে সেটিও স্টেশন মাস্টারদের পক্ষে যায়। আদালতের রায় বাস্তবায়নে রেলওয়ে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি সুপারিশ পাঠায়। ওই সুপারিশে রেলওয়ের স্টেশন মাস্টারদের বিভিন্ন গ্রেড আদালতের রায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিন্যাস করা হয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া প্রজ্ঞাপনে দুটি গ্রেডের ক্ষেত্রে সুপারিশ বলবৎ রাখা হয়েছে। বাকি চারটি গ্রেডের স্টেশন মাস্টারদের বেতন কাঠামো সুপারিশের চেয়ে এক ধাপ কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭৭ সালের সরকারি বেতন কাঠামোয় স্টেশন মাস্টার, সহকারী স্টেশন মাস্টার, স্টেশন মাস্টার গ্রেড-১ থেকে ৪ ও স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে রেলের একই পোস্টের বিভিন্ন কর্মীর বেতন বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। ফলে রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ও কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতিসহ পাঁচজন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন। ২০০৯ সালের ১৬ আগস্ট শুনানিতে রিটের রায় পিটিশনারদের অনুকূলে ঘোষণা করেন আদালত। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রেল প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিপিএল দায়ের করা হয়। সিপিএল মঞ্জুর হলে রেলওয়ে সিভিল আপিল দায়ের করে। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত শুনানিতে রেলের আপিল দোতরফা সূত্রে খারিজ হয়ে যায়। রিট পিটিশনের রায় বহাল থাকায় তত্কালীন অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর থেকে একটি রিভিউ পিটিশন দায়ের করা হয়। ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রিভিউ পিটিশনটি তামাদিতে খারিজ হয়ে গেলে রেলওয়ের স্টেশন মাস্টাররা গ্রেড উন্নীত করার দাবি চূড়ান্তভাবে অর্জন করেন।

জানতে চাইলে রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা জাফর আহমেদ মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, হাইকোর্ট স্টেশন মাস্টারদের বেতন গ্রেড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আদালতের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশও পাঠিয়েছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় স্টেশন মাস্টারদের বেশকিছু গ্রেড বিন্যাস বাদ দিয়ে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে। বিষয়টি আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমরা আদালতের মাধ্যমে স্টেশন মাস্টারদের বেতন বৈষম্যের বিষয়টি আদায় করব।

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে বেতন কাঠামো সংশোধনের বিষয়ে একটি সুপারিশ পাঠানো হয়। গত বছরের ২৩ মার্চ রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক বরাবর একটি সুপারিশ দেয়া হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য। ওই সুপারিশে এএসএম (সহকারী স্টেশন মাস্টার)-এর গ্রেড ১৫ থেকে ১৩, এসএম-৪ (স্টেশন মাস্টার-৪)-এর বেতন গ্রেড ১৪ থেকে ১৩, এসএম-৩-এর বেতন গ্রেড ১৩ থেকে ১১, এসএম-২-এর বেতন গ্রেড ১২ থেকে ১০, এসএম-১-এর বেতন গ্রেড ১১ থেকে ১০ এবং স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টের বেতন গ্রেড দশম থেকে নবম গ্রেডে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ আগস্ট সমগ্রেডের পদের সঙ্গে তুলনা করে অর্থ মন্ত্রণালয় স্টেশন মাস্টারদের নতুন বেতন গ্রেড প্রদানে সম্মতি দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আছমা আরা বেগম স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্টেশন মাস্টারদের পাঁচটি পদের গ্রেড (স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট ব্যতীত) উন্নীত করার সম্মতি দেয়া হয়। রেলের সুপারিশে এএসএমের গ্রেড ১৩ থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয় ১৪তম গ্রেড দেয়ার নির্দেশ দেয়। এছাড়া এসএম-৩-এর ১১তম গ্রেডের পরিবর্তে ১২তম, এসএম-২-এর দশম গ্রেডের স্থলে ১১তম গ্রেড দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এসএম-৪-এর গ্রেড সুপারিশ মোতাবেক ১৩তম গ্রেডই বহাল রেখেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

স্টেশন মাস্টারদের বেতন বৈষম্য নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, আদালতের রায় অনুসরণ করে আমরা এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে স্টেশন মাস্টারদের গ্রেড উন্নীত করার বিষয়ে সুপারিশ দিয়েছি। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনাও এসেছে। বেতন গ্রেড উন্নীতকরণের কয়েকটি বিষয় নিয়ে স্টেশন মাস্টারদের আপত্তি রয়েছে। আশা করি বিষয়টি দ্রুত সুরাহা করা হবে।