তবে দলটির সম্ভাব্য কর্মসূচি ঠেকাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মাঠে সক্রিয় ছিলেন বিএনপি ও জামায়াতের সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। যেকোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে সতর্ক ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ২৬ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গতকাল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সকাল থেকেই নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের গুলিস্তান কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমন্ডির দলীয় সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নীরবতা লক্ষ করা গেছে। সরজমিনে দেখা যায়, এসব জায়গায় স্থানীয় বিএনপি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতি থাকলেও আওয়ামী লীগের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, প্রেস ক্লাব, শাহবাগ, ফার্মগেট, মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই সরব উপস্থিতি দেখা গেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা, সংসদ ভবনের পূর্বপাশের সড়ক, ডেমরা, মিরপুরের রূপনগর ও কাফরুল এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেন তারা। আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও গ্রেফতার ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানানো হয় বিক্ষোভ মিছিল থেকে।

এদিন অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ মিছিল, মোটরসাইকেল শোডাউনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের নামে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো নাশকতা করতে না পারেন, সেজন্য সক্রিয় থাকার কথাও জানান তারা। গতকাল সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক মিছিল শেষে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘যারা জনগণের জীবন থেকে সুন্দর ভোর, সূর্যের আলো, স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন এবং মানুষের বাঁচার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারা এখন নানা কায়দায় তাদের চুরি ও পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সৃষ্টির চেষ্টা করছে। পাচার করা টাকা দিয়ে পতিত শক্তি আবারো দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম রুখে দেয়া হবে।’

রাজধানীতে এদিন বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরাও। গতকাল সকালে জামায়াতে ইসলামীর একটি মিছিল থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সাংবাদিক জানান, জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শেষে এ ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর হামলার এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতিও দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। একই দিন আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত সব গুম, খুন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে রাজধানীর বিজয়নগরে সমাবেশ করে ১১-দলীয় ঐক্যজোট।

এছাড়া গতকাল ভোর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাড়তি উপস্থিতি দেখা গেছে। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কার্যালয় এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের আশপাশের সড়কগুলোতে ছিল কড়া নজরদারি। সকাল থেকেই বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়ে ব্যক্তি কিংবা যানবাহনে তল্লাশি চালাতে এবং র‍্যাব ও পুলিশকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টহল দিতেও দেখা যায়।

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি সারা দেশে কর্মসূচি পালন করবে বলে আশঙ্কা করেছিল পুলিশ। তবে রাজধানী ঢাকায় দলটির নেতাকর্মীরা কোথাও প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করতে পারেননি বলে মনে করছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তারা বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে নাশকতা ঘটিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। তবে পুলিশের কঠোর অবস্থান ও আগাম প্রস্তুতির কারণে সে চেষ্টা সফল হয়নি।

গতকাল ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। সে কারণে রাজধানীজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

দুই বছর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর থেকে দলটির অধিকাংশ নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কয়েক দিন ধরেই আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কর্মসূচি ঘিরে নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়। ফলে রাজধানীর কোথাও দলটির নেতাকর্মীরা বড় ধরনের কোনো জমায়েত বা মিছিল করতে পারেননি।

এর আগে সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ২৬ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গতকাল ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) নিয়াজ মেহেদীর পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজধানীর আটটি থানা এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানমন্ডি থেকে ১০ জন, মোহাম্মদপুর থেকে আট, রমনা থেকে দুই, খিলক্ষেত থেকে দুই এবং বংশাল, কদমতলী, মিরপুর ও তুরাগ থানা এলাকা থেকে একজন করে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাজধানীর বাইরেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মসূচি পালন করেছেন ছাত্রদল ও যুবদলসহ বিএনপির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জে কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ঢাকার বাইরেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতির খবর আগেই জানিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোর থেকেই নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের বাড়তি উপস্থিতি ছিল। নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবিকে টহল দিতে দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ হিসেবে সেনাসদস্যরা মোতায়েন থাকবেন।