দেশে সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৪ লাখ ৪২ হাজার ৬৪৪। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর প্রায় ৫৯ শতাংশই নিয়োগ হয়েছে গত দেড় দশকে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি ও পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার ১৩৬।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য জনবল নিয়োগ হলেও এসব নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে এ নিয়ে বারবার অভিযোগও তোলা হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ২০১৬ সালের এক প্রকাশনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, বিজ্ঞপ্তির বাইরে মাত্রাতিরিক্ত নিয়োগ, পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পদে নিয়োগে ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্যও উঠে আসে ওই প্রকাশনায়। এছাড়া গত দেড় দশকে প্রাথমিক, মাধ্যমিকসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্ন ফাঁস, আর্থিক লেনদেন ও ঘুস গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্যমতে, গত দেড় দশকের পুরো সময় জুড়েই এ চিত্র কমবেশি একই রকম ছিল। তবে শেষের বছরগুলোয় তা আরো প্রকট হয়ে উঠেছিল। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত দেড় দশকে শিক্ষাসহ আমাদের দেশের প্রতিটি সেবা খাতেই বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে যে গবেষণাগুলো করেছি সেখানে বারবারই নিয়োগে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেন, প্রশ্ন ফাঁসসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। শিক্ষার মান বাড়েনি, শিক্ষা ব্যয় কমেনি, কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায়নি এবং পুরো জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষায় এ ধরনের ঘটনার অবসান ঘটাতে হলে পুরো কাঠামোই পরিবর্তন করতে হবে। গত দেড় দশকে আমাদের সেবা খাতগুলো এমন অবস্থায় নেয়া হয়েছে, এর পুরো কাঠামো বদলাতে হবে। তবে এটি সময়সাপেক্ষ। এছাড়া এ সিস্টেমে যারা অন্যায়ভাবে সুবিধাভোগী হয়েছে, তাদের কারণে বিষয়টি চ্যালেঞ্জিংও হবে। এজন্য মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে ও সংকটগুলো চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোতে হবে।’ 

বার্ষিক প্রাথমিক শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫১৩। তাদের মধ্যে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫৭৯ জনের নিয়োগ হয়েছে গত ১৫ বছরে। অর্থাৎ বর্তমানে কর্মরতদের প্রায় ৬২ শতাংশ এ সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত। তবে অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নিয়োগে প্রশ্ন ফাঁস, আর্থিক লেনদেন ও দলীয়করণের ঘটনা ঘটেছে।

২০২৩ সালে তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য ঘুস গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। পরে ভুক্তভোগীরা এ-সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ গণমাধ্যমে তুলে ধরলে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ওই টাকা ফেরত দেয়া হয়। সর্বশেষ চলতি বছরে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ না করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এসএম হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষক দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে প্রাথমিকের বেতন কাঠামো ভালো না হওয়ায় এখানে সাধারণত সবচেয়ে ভালো ফলাফলধারীরা যান না। এরপর আবার যারা যান তাদের মধ্যেও নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রশ্ন ফাঁস, দলীয়করণসহ নানা অনিয়ম হয়। ফলে আমাদের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষামান নিশ্চিতে একটি বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এরই মধ্যে গবেষণা প্রতিবেদনগুলোয় আমরা দেখতে পাচ্ছি, একজন তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর যে পর্যায়ের ভাষাগত ও গাণিতিক দক্ষতা থাকা উচিত; বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই তা নেই। এটিই প্রমাণ করে আমাদের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে পারিনি। এছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে এখনো আমাদের অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। এটির কারণও কিন্তু দক্ষ শিক্ষকের অভাব। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ শিক্ষকদের পড়ানোর ধরনের ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে। একজন শিক্ষক যখন আকর্ষণীয়ভাবে পড়ান তখন শিক্ষার্থীরাও আগ্রহের সঙ্গে শেখে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রাথমিক থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরেই শিক্ষক নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত যোগ্যতা। তবে প্রাথমিকের ক্ষেত্রে আমাদের বেতন কাঠামোও উন্নত করতে হবে। যেহেতু শিক্ষার্থীদের ভিত্তিটা এখান থেকেই তৈরি হয় তাই এখানে যাতে সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষকরা আসেন সে অনুযায়ী বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রাথমিক পর্যায়েই যদি ঘাটতি তৈরি হয়ে যায়, তাহলে পরেও সেই ঘাটতি থেকে যাবে।’

ব্যানবেইসের ২০২৩ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষক সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৮০। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ হয়েছে ৬ হাজার ৪১২ জনের। এছাড়া এমপিওভুক্ত বিদ্যালয় সরকারীকরণের ফলে সহস্রাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক সরকারি বেতন কাঠামোর আওতাভুক্ত হয়েছেন। তবে অভিযোগ আছে, পিএসসির অধীনে নেয়া বেশকিছু পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে, পিএসসির উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি টিম পরীক্ষাগুলোর প্রশ্ন ফাঁস করত। এরই মধ্যে এ ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

কলেজের ক্ষেত্রে বর্তমানে মোট শিক্ষক সংখ্যা ২৭ হাজার ৭৫২। এর মধ্যে বিসিএসের মাধ্যমে গত ১৫ বছরে মোট ৭ হাজার ৩৪৫ জনকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এমপিওভুক্ত কলেজগুলোকে সরকারীকরণ করায় প্রায় দুই হাজার শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তবে এসব কলেজের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, কলেজ সরকারীকরণের ক্ষেত্রে তাদের নির্দিষ্ট অংক ঘুস হিসেবে দিতে হয়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বরিশালের উপজেলা পর্যায়ের একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক বলেন, ‘কলেজ সরকারি করার আগে আমাদের সব শিক্ষকের কাছ থেকে দুই ধাপে ৪ লাখ টাকা নেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এটি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ লোকজনকে দিতে হবে। অন্যথায় কলেজ সরকারি হবে না।’

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৯৯। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে গত দেড় দশকে ৪৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন অন্তত ৮ হাজার ৮০০ জন। তবে প্রায় নিয়মিতই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, শর্ত শিথিল, আর্থিক লেনদেনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ চলতি বছর ইউজিসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির নিয়ম মানছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কখনই কারো দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা উচিত না। এক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত। প্রথমত, মেধা ও একাডেমিক যোগ্যতা, দ্বিতীয়ত, চারিত্রিক গুণাবলি যেমন তার মধ্যে সততা, নৈতিকতা, মানবিকতার মতো গুণাবলি আছে কিনা এবং তৃতীয় বিষয়টি হলো গবেষণাকাজের ইচ্ছা ও দক্ষতা আছে কিনা। তবে উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে গবেষণার বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে শুধু গবেষণাপত্র নয়, ভালো জার্নালে অর্থাৎ পিআর রেটেড জার্নালে গবেষণাপত্রের বিষয়টি দেখতে হবে। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে এ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যারা আসবেন, তারা অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষকই হবেন।’

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।