বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই আমরা একটি ‘লুণ্ঠনের অর্থনীতি’ চালু করেছি। এ লুণ্ঠনের অর্থনীতিতে প্রাপ্ত সম্পদ বারবার পুনর্বণ্টন করে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়া হয়, ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির এ ‘মূল কাঠামো’ যদি আমরা বদলাতে না পারি, তবে খাতভিত্তিক যত সমস্যার কথাই বলি না কেন, সেগুলোর সমাধান হবে না।
গতকাল রাজধানীর পল্টনে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ: আগামী দিনের অগ্রাধিকার’ শিরোনামে এ সেমিনার যৌথভাবে আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘পতিত সরকার তরুণদের কোনো কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করে জনমিতিক লভ্যাংশকে জনমিতিক বোঝায় রূপান্তর করেছে। তাদের নিষ্ক্রিয়তা, ভুল নীতি ও লুটপাটের কারণে আমাদের মাথায় অনেক ঋণের বোঝা চাপছে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনিশ্চয়তার অনুভূতি থেকে বের করে আনতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, মানসম্মত শিক্ষা ও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়াতে হবে।’
সেমিনারে বিশেষ অতিথি জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই আমরা এখানে একটি লুণ্ঠনের অর্থনীতি চালু করেছি। লুণ্ঠনের অর্থনীতিতে প্রাপ্ত সম্পদ বারবার পুনর্বণ্টন করে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এখান থেকে বের হতে না পারলে আমরা যত চমৎকার নীতিই গ্রহণ করি না কেন, তা খুব একটা কাজ করবে না।’
অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘কেবল নীতি সুদহার নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়, কারণ সমস্যাটি মূলত সরবরাহজনিত। খাদ্যশস্যের আগাম আমদানি, সঠিক মজুদ ব্যবস্থা এবং চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক করা দরকার।’
রাজস্ব আহরণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজস্ব আহরণ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুই ভাগে ভাগ করা, করের আওতা বাড়ানো এবং স্বয়ংক্রিয়করণ নিশ্চিত করতে হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের কথা মাথায় রেখে আমাদের বর্তমান ট্যারিফ কাঠামোর আমূল সংস্কার করা জরুরি। এছাড়া অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউয়ারের (একিউআর) মাধ্যমে ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের হিসাব বের করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর জ্বালানি নিরাপত্তায় দ্রুত এলএনজি আমদানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতির ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।’
এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের আসল ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। এ সংকটে কয়লাভিত্তিক ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করা দরকার। এর মাধ্যমে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে এবং বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত গ্যাস সাশ্রয় করে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্প-কারখানাগুলোতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আপৎকালীন সময়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল কিছুটা পরিবর্তন করা দরকার।’










