জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল দেশের সব খাতে স্থিতিশীলতা ফেরার পাশাপাশি সুশাসন ফিরে আসবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শগত মতপার্থক্য থাকলেও প্রতিশোধমূলক রাজনীতি থাকবে না। বিভিন্ন খাতে শৃঙ্খলা ফেরার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গতিশীলতা ফিরে আসবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশকিছু বিষয়ের ইতিবাচক পরিবেশ ফিরলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক রূপান্তর হলেও অর্থনীতির গতি তৎপরতা বাড়ানোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

গতকাল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ইন্টেরিম ব্যালেন্স-শিট’ শীর্ষক এ ভার্চুয়াল সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন ও রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শগত মতপার্থক্যের বিষয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘আমরা যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের কথা বলি, তখন দেখা যায়—এ বিভাজনের বড় একটি অংশই পলিটিক্যালি ক্রিয়েটেড। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলো আদর্শগত পার্থক্যের জায়গা থেকে সরে গিয়ে এক ধরনের ট্রাইবাল রাজনীতি শুরু করে। আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি—এ দ্বৈত বিভাজন ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে এক দল ক্ষমতায় এলে অন্য দলকে দমন করে, নিপীড়নের রাজনীতি শুরু হয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রও প্রতিশোধমূলক রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের পর একটি বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে বিভাজন থাকবে, আদর্শ ও নীতিগত পার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই বিভাজনের ভেতর দিয়েই খোলা বিতর্ক, পারস্পরিক সহনশীলতা ও সহাবস্থানের একটি পরিবেশ গড়ে উঠবে।’

সাবেক বাণিজ্য সচিব ফারুক আহমদ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমার মনে হয়, ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সময় আমাদের সামনে বেশকিছু বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি প্রত্যাশা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে আসে। প্রথমটি ছিল—দীর্ঘদিন ধরে যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল এবং যেগুলো সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিকীকরণে আক্রান্ত হয়েছিল, সেগুলোকে সংস্কারের মাধ্যমে জনবান্ধব ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করা। যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবা করতে পারে, দুর্নীতি কমে এবং সুশাসনের একটি ভিত্তি তৈরি হয়। দ্বিতীয় প্রত্যাশাটি ছিল, এই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।’

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুনুর রশীদ বলেন, ‘২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিক এবং দ্বিতীয় প্রান্তিক বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই অর্থনীতি গতিশীলতায় ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তত পতনটা ঠেকানো গেছে। সেই ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় কিছুটা আমরা ভিজিবল ইমপ্রুভমেন্ট দেখতে পেয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে সীমিত হলেও দৃশ্যমান উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ম্যাক্রো অর্থনৈতিক ভিত্তিতে (ম্যাক্রো ফান্ডামেন্টালস) কয়েকটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করা।’

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘দেশের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ব্যবসার পরিবেশ বর্তমানে খুব একটা স্বস্তিকর অবস্থানে নেই। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২০ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। এডিপি বাস্তবায়ন কম হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রাইভেট সেক্টরের ওপর—বিশেষ করে শিল্প ও অবকাঠামোভিত্তিক খাতে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় ম্যানুফ্যাকচারিং ও রিটেইল খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শহরের রিটেইল ব্যবসা, এসএমই খাত—সব জায়গায়ই সংকট প্রকট। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ এসএমই এরই মধ্যে কার্যত দেউলিয়া হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষিত বেকারত্ব। চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের বাজার সংকুচিত হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি নেতিবাচক ইঙ্গিত। আমরা যদি দেশের রফতানি খাতের দিকে দেখি, গার্মেন্টস শিল্পের পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক।’

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আঞ্চলিক অস্থিরতা দেখা গেছে। যেম পাকিস্তানের পানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। বিএনপি ও জমায়াতে ইসলামী ইশতাহারে ভূরাজনীতি নিয়ে কথা এসেছে কিন্তু সুনির্দিষ্ট কিছু দেখা যায়নি। ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে এ বছরে। নবায়ন করতে হবে, যা আগামী সরকারকে করতে হবে। অন্যদিকে বাণিজ্য বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া বড় বিপদে ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকায় এসে শুরুতেই বলেছেন চীনের সঙ্গে যেন বেশি ঘনিষ্ঠ নয় বাংলাদেশ। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ছে, আরো বাড়বে।’