বহর সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক আকাশপথে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ শীর্ষক আয়োজনে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার এবং বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এম রুমী এ হোসেন। নতুন এ চুক্তির অধীনে চারটি দূরপাল্লার ‘এ৩৫০-৯০০’ ওয়াইডবডি ও ছয়টি আঞ্চলিক রুটের ‘এ৩২১ নিও’ ন্যারোবডি—মোট ১০টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে। তবে বাণিজ্যিক গোপনীয়তার কারণে উড়োজাহাজগুলোর চূড়ান্ত মূল্য প্রকাশ করা হয়নি।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, দেশে আন্তর্জাতিক আকাশপথের ৮০ শতাংশ যাত্রী বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো পরিবহন করে, যেখানে বিমানের অংশ ২০ শতাংশ। এ চুক্তির মাধ্যমে অন্তত ৫০ শতাংশ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বহর সংকটের কথা উল্লেখ করে ২০২৮ সালের মধ্যেই অন্তত একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের জন্য এয়ারবাস কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে উড়োজাহাজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র (এমআরও) স্থাপনে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানান তিনি।
বিমানমন্ত্রী আরো জানান, যুক্তরাজ্যের পরিদর্শনে সিলেট বিমানবন্দরে ৯৮ শতাংশ এবং ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে ৯৪ শতাংশ নিরাপত্তা সূচক অর্জিত হয়েছে। তাই ২০১৭ সাল থেকে ইইউ আরোপিত ‘হাই রিস্ক কার্গো’ তকমা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘নিজেদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং বহর আধুনিকায়নের তাগিদ থেকেই সরকার উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান সরকার যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশের মানুষের স্বার্থ ও ব্যবসায়িক যৌক্তিকতাকে গুরুত্ব দেয়। নতুন এসব উড়োজাহাজ বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ বাড়াবে, রফতানি বৃদ্ধি করবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এয়ারবাসের সঙ্গে এ চুক্তি কেবল উড়োজাহাজ কেনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে বিস্তৃত করবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘এয়ারলাইনস কেবল একটি পরিবহন নয়, এটি একটি দেশের পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান। বিমান কেবল উড়োজাহাজ কিনছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রবাসীদের স্বপ্ন, যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের আশা আর স্বজনদের আবেগ বহন করছে। লাল-সবুজের পতাকা এবং বাংলায় অভ্যর্থনা পাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আকাশে নিয়ে যাবে এ এয়ারবাস।’
বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এম রুমী এ হোসেন জানান, দেশের আন্তর্জাতিক যাত্রী বাজারকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিমানের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হবে। নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতায় এ বিনিয়োগ করার কথা জানিয়ে তিনি এক বছরের মধ্যে যাত্রীসেবায় পরিবর্তনের কথা জানান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘প্রযুক্তি ও জ্বালানিসাশ্রয়ী এ উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহর ও সেবার মান বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, ‘এয়ারবাস বেছে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপত্তা, আধুনিকায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতায় বিনিয়োগ করেছে। আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্প্রসারণের পথে এ চুক্তি নতুন গতি আনবে।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সারাহ কুক বলেন, ‘এ চুক্তি বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ওপর আস্থার প্রমাণ। এ প্রক্রিয়ায় ইউকে এক্সপোর্ট ফাইন্যান্সসহ ইউরোপীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ সহায়তা রয়েছে।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটজ বলেন, ‘ইউরোপের প্রযুক্তি ও মেধার প্রতীক এয়ারবাসে জার্মান প্রকৌশলীদের অবদান রয়েছে। ২০৩০ ও ২০৪০ সালের অর্থনৈতিক চাহিদাকে মাথায় রেখে বাংলাদেশ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, ‘এটি কেবল উড়োজাহাজ কেনা নয়, বরং প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে একটি স্বনির্ভরতার সূচনা। এটি বিদেশী এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপন করবে।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়েগা ওচহোওয়া দি চিনচিত্রু বলেন, ‘এয়ারবাসের প্রযুক্তি পরিচালনা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উড়োজাহাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। এটি বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।’
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া অনুষ্ঠানে ধারণকৃত ভিডিও বার্তায় বক্তব্য দেন এয়ারবাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গিয়োম ফোরি। অনুষ্ঠানে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, কূটনৈতিক কোরের প্রতিনিধি ও দেশী-বিদেশী আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।










