যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ৫ এপ্রিল থেকে সব আমদানি পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক এবং ৯ এপ্রিল থেকে প্রায় ৬০টি দেশের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তার এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য, তার এ পদক্ষেপ অন্যায্য বাণিজ্যনীতির প্রতিশোধ হিসেবে নেয়া হয়েছে। তার দাবি, এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট ‘দয়া’ দেখিয়েছেন। এ শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি দেশটিকে আবারো ধনী করে তুলবে। খবর বিবিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যতে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত"বলে মন্তব্য করেছেন ২০ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়া ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেইন। তার এমন মন্তব্য চীনের মতো অন্য অনেক দেশের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিলে গেছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করে জানিয়েছে, তারা দেশটির বিরুদ্ধে পাল্টা দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।
গতকাল সকালে এক বিবৃতিতে ভন ডার লেইন বলেন, ‘আমদানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপের কারণে অনিশ্চয়তা বাড়বে, যা বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের জন্য মারাত্মক"পরিণতি ডেকে আনবে।’ সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভন ডার লেইন উল্লেখ করেন, এখন সেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইউরোপ ঐক্যবদ্ধভাবে পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে যদি আলোচনা ব্যর্থ হয় তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, "‘যদি আপনি আমাদের একজনের বিরুদ্ধে যান, তার মানে আপনি আমাদের সবার বিরুদ্ধে যাচ্ছেন।’
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, ‘সিদ্ধান্তটি "ভুল" হয়েছে।’ তবে তিনি বাণিজ্যযুদ্ধ প্রতিরোধ করতে"যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ‘স্পেন একটি উন্মুক্ত বিশ্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।’
আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী টাওইসেক মিচেল মার্টিন বলেছেন, ‘ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ভীষণ দুঃখজনক"এবং কারো জন্যই লাভজনক নয়।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ নতুন শুল্ক আরোপের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে এলিসি প্রাসাদে বৈঠক করবেন বলে প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে চীনের পণ্যের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ শুল্কের ওপর আরো ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে মোট শুল্ক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে শুল্ক বাতিল"করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, চীন নিজ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য কঠোরভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।"
যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে তাইওয়ান ৩২ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হচ্ছে। তারা এ পদক্ষেপকে অত্যন্ত অযৌক্তিক"বলে অভিহিত করেছে। তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী চো জং তাই বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানাবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সু মন্তব্য করেছেন, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ একটি বাস্তবতায়"পরিণত হয়েছে। তার সরকার এ সংকট কাটানোর"উপায় খুঁজে দেখবে।
জাপান বলেছে, তাদের ওপর ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং মার্কিন-জাপান চুক্তিগুলো লঙ্ঘন করতে পারে।
থাইল্যান্ড জানিয়েছে, তারা তাদের ওপর ৩৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ নিয়ে আলোচনা করবে।
ইসরায়েলের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষণার আগেই কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর সব শুল্ক বাতিল করেছিলেন। এখন তাদের ওপর ১৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হওয়ায় তারা সম্পূর্ণভাবে হতবাক। স্থানীয় গণমাধ্যমকে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত এ পদক্ষেপকে প্রতিরোধ করবে।’
হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, তাদের শুল্ক আরোপ চীনের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ ছিল। কারণ চীন মার্কিন পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে। মার্কিন বাণিজ্যে শুল্ক-বহির্ভূত" বাধা আরোপ করেছে। সেই সঙ্গে চীন এমনভাবে কাজ করেছে, যা আমেরিকান অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলোকে দুর্বল করে।
যে দেশগুলো সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ বেজলাইন শুল্কের আওতায় পড়েছে, সেসব দেশের নেতারাও ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ বলেছেন, ‘এ অন্যায় শুল্কারোপের"জন্য আমেরিকানদের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে।’ তবে তার সরকার কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেবে না বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেব না, যার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে এবং প্রবৃদ্ধি ধীর করে দেবে।’
ডাউনিং স্ট্রিটের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের ওপর কম শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির জন্য দেশটির সরকারের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস বলেছেন, ‘সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহী, যা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ন্যায্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে।’
দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল বুধবার কংগ্রেসে ‘অর্থনৈতিক প্রতিদান আইন’ নামে একটি আইন অনুমোদন করেছে যা ট্রাম্পের আরোপ করা ১০ শতাংশ শুল্কের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দেশগুলোকে সতর্ক করেন যে তারা যেন প্রতিশোধ না নেয়। তারা যেন মার্কিন সরকারের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তিনি বলেন, ‘যদি আপনি প্রতিশোধ নেন, তাহলে উত্তেজনা বাড়বে।’”ফক্স নিউজকে তিনি এ কথা বলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বৃহত্তম বাণিজ্য সঙ্গী কানাডা ও মেক্সিকোর নাম বুধবারের ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়নি। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, তারা আগের নির্বাহী আদেশ অনুসারে এ দুই দেশের সঙ্গে আচরণ করবে। যেখানে ফেন্টানাইল এবং সীমান্ত সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দুটি দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি বলেন, ‘শুল্ক আরোপের কারণে কানাডার ওপর এখনো প্রভাব পড়বে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শুরু হওয়া ২৫ শতাংশ শুল্কের মতো পদক্ষেপ "সরাসরি লাখো কানাডিয়ানের ওপর প্রভাব ফেলবে। তিনি এ শুল্কগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের মাধ্যমে লড়াই করার কথা বলেছেন। তার মতে, মার্কিন শুল্ক বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করবে।










