ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট আজ। প্রশিক্ষণ, ব্যালট ছাপানো ও লজিস্টিক সহায়তা, পরিবহন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন, প্রযুক্তি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, গণভোট আয়োজন, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের কারণে এবারের সামগ্রিক খরচ অতীতের সব নির্বাচনকে ছাড়িয়ে গেছে। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কমিশনের নির্বাচন পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুকূলে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আর গণভোট, পোস্টাল ব্যালটসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা।

এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তিনটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিতর্কিত ওই নির্বাচনগুলোয় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও তা ছিল ত্রয়োদশ নির্বাচনের ব্যয়ের চেয়ে কম। নির্বাচনের ব্যয় প্রাক্কলন অনুযায়ী, এবার আসনপ্রতি গড় ব্যয় হবে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। বিগত আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দ্বাদশ নির্বাচনে আসনপ্রতি গড় ব্যয় ছিল ৭ কোটি টাকার কিছু বেশি।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রগুলো বলছে, এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া পোস্টাল ব্যালটে নেয়া হচ্ছে প্রবাসীদের ভোট। সে কারণে ব্যয় বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক।

নির্বাচন কমিশনের বাজেট এবং ফাইন্যন্স শাখার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনে ব্যয় ৪ হাজার কোটি টাকায় উঠবে না। সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। সাধারণত বাজেট বেশি ধরা হয় আপৎকালীনের কথা চিন্তা করে।’

ers

ত্রয়োদশ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখনো অনেক খরচ পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা হয়নি। প্রায় নয় লাখের মতো জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও জেলা পর্যায়ের অফিস থেকে এসে জমা হয়েছে, যেগুলো ব্যয়ের খাতায় ওঠেনি। তবে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী ব্যয় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার ওপর ওঠেনি।’ তবে সেটি আরো অনেক বাড়বে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

নির্বাচন কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে দুই ধাপে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রথম ধাপে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় ধাপের অর্থ বরাদ্দে দৈনিক খোরাকি ভাতা, মেশিন ও সরঞ্জামাদির ভাড়া, প্রচার ও বিজ্ঞাপন ব্যয়, ক্ষতিপূরণ, আপ্যায়ন ব্যয়, যানবাহন ব্যবহার (চুক্তিভিত্তিক), যাতায়াত ব্যয়, ভেন্যু ভাড়া, শ্রমিক মজুরি, পরিবহন ব্যয়, পেট্রল, অয়েল ও লুব্রিক্যান্ট, প্রশিক্ষণ, মুদ্রণ ও বাঁধাই, স্ট্যাম্প ও সিল, অন্যান্য মণিহারি, সম্মানী, অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ব্যালট বাক্স ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি খাত ধরা হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পাঠাতে ও পেতে এ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য প্রতিটি ব্যালটে ৭০০ টাকা, আর অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ব্যালটে ব্যয় হয় ২৩ টাকা।

দেশের ইতিহাসে নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি এবার ভোটার সংখ্যাও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ত্রয়োদশ নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন। নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ২৩২ জন।

এর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের অধীনে ওই নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ওই নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় নিয়ে যদিও নানা ধরনের সমালোচনা হয় তখন।

২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা ও নির্বাচন পরিচালনার জন্য মোট ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া ওই ভোটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনায় ৮১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেছনে ব্যয় হয় ১৮৩ কোটি টাকা। বিতর্কিত ওই নির্বাচনে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন একক প্রার্থীরা। আর ভোট হয় কেবল ১৪৭ আসনে। নির্বাচনী মোট এলাকার অর্ধেকে ভোট হওয়ায় বরাদ্দের তুলনায় খরচ অনেক কম হয়।

দেশে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে মোট ব্যয় হয় ১৬৫ কোটি টাকা, যেখানে নিবন্ধিত ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ। আর ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনে মোট ব্যয় হয়েছিল ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা।