সাতক্ষীরা জেলায় ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেড় লাখ টনের বেশি রফতানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। যার রফতানি মূল্য সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে করোনা মহামারী ও মানসম্মত না হওয়ায় গত দুই বছরে রফতানিযোগ্য এসব চিংড়ির বড় অংশই দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, পাঁচ বছরে জেলায় রফতানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ১৪৬ টন। এর মধ্যে বাগদা চিংড়ি ১ লাখ ১৮ হাজার ৩০৮ টন। গলদা চিংড়ির পরিমাণ ৩৩ হাজার ৮৩৭ টনের মতো। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২৫ হাজার ৩৫৪ টন বাগদা ও ৬ হাজার ৩৪ টন গলদা চিংড়ি। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৪৮৫ টন বাগদা ও ৬ হাজার ১০৬ টন গলদা, ২০১৭-১৮ বাগদা ২০ হাজার ৯৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫২৫ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাগদা ২১ হাজার ৪৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫৪২ টন এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৮৭ টন বাগদা ও ৮ হাজার ৬৩০ টনের মতো চিংড়ি উৎপাদন হয়। উৎপাদিত এসব চিংড়ির রফতানিমূল্য ৭ হাজার ৬০৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

সূত্র বলছে, জেলায় বছরে প্রায় ৬০ হাজার নিবন্ধিত ঘেরে চিংড়ি চাষ করা হয়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চিংড়ি চাষ করেন দেবহাটা উপজেলার শ্যামনগর এলাকার চাষী মো. সামছুর রহমান। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমেও ২৫০ বিঘা ঘেরে চিংড়ি চাষ করেছি। তবে দু-তিন বছর চিংড়ির ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদিত চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থা আরো সমন্বয় করার দরকার। তা না হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে রফতানিজাত চিংড়ি বিক্রি করে চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

রফতানিজাত চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ উৎপাদনে সাতক্ষীরা খুবই সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান। তিনি বলেন, এখানকার মাটি, পানি ও আবহাওয়া সব ধরনের মাছ চাষের উপযোগী। প্রতি বছর এ জেলাতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার চিংড়ি অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি রফতানি করা হয়। এছাড়া সাদা মাছও ব্যাপকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। এক লাখ টনের ওপরে সাদা মাছ উৎপাদন হয়, যা এ জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। মাছ চাষের সঙ্গে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত।

আশির দশক থেকে মূলত সাতক্ষীরায় বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি উৎপাদন শুরু হয়। দেশের যে কয়টি জেলাতে রফতানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয়, তার মধ্যে অন্যতম এ জেলা। প্রতি বছর সাতক্ষীরা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাগদা ও গলদা চিংড়ি রফতানি হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় ভূমিকা রাখছে। তবে জেলার অনেক চাষী অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ করছেন। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সাতক্ষীরার চিংড়ি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান দীপা সি ফুডের স্বত্ব্বাধিকারী দীন বন্ধু দাস বলেন, কয়েক বছর মানসম্মত চিংড়ি উৎপাদন না হওয়ায় বিদেশে রফতানি কম হচ্ছে। ফলে বিপুল পরিমাণ চিংড়ি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ হুমায়ুন কবির এ বিষয়ে বলেন, যেকোনো মাছ উৎপাদনে এ জেলা খুবই সম্ভাবনাময়। সাদা মাছের পাশাপাশি বছরে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিংড়ি বিদেশে রফতানি হয়। মাছচাষীরা যাতে আগামীতে আরো বেশি বেশি উৎপাদন করতে পারেন, সেজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। বিশেষ করে যারা প্রান্তিক পর্যায়ের মৎস্যচাষী, তাদের সরকারের প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া হবে।