দুই বছর আগে দেশে রেকর্ড ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়। কভিড পরিস্থিতির কারণে চাহিদা কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন কমে প্রায় এক কোটি কেজি। তবে চলতি বছর বিলম্বিত বৃষ্টিপাতে ১০ কোটি কেজি চা উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন বাগানমালিকরা। কভিডের কারণে বিধিনিষেধে শিথিলতার পাশাপাশি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ অফিস-আদালত চালু হওয়ায় চাহিদা বৃদ্ধিতে প্রতিটি নিলামেই বাড়ছে চায়ের দাম। 

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক নিলাম কেন্দ্র চট্টগ্রামের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি নিলামে বর্তমানে গড়ে ৩২-৩৫ লাখ কেজি চা বিক্রির জন্য প্রস্তাব করা হচ্ছে। করোনার কারণে আগের নিলামগুলোতে ৬০-৭০ শতাংশ চা বিক্রি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নিলাম বাজারে গড়ে ৮০ শতাংশের বেশি চা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। নিলামে চা ক্রয়ে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ায় চায়ের দামও প্রতিটি নিলামে ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য বলছে, সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে দেশের ১৬৭টি বাগানে চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ৭ হাজার কেজি, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪ লাখ ৬৩ হাজার কেজি বেশি। অক্টোবরে এসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টিপাত থাকায় মৌসুমের শেষার্ধেও ভালো চা উৎপাদনের আশা করছেন বাগানমালিকরা। শেষ দিকে বাগানে চা উৎপাদন ও ভালো মানের চায়ের পরিমাণ কমলেও নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে আগের বছরের চেয়ে বেশি চা উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন তারা। 

চা উৎপাদনের মাসিক বুলেটিন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সার্বিক চা উৎপাদন হয়েছে ৬ কোটি ৪৭ লাখ ৫৫ হাজার কেজি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চা উৎপাদন হয়েছিল ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৫২ হাজার কেজি। মাসভিত্তিক উৎপাদনে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৩ লাখ ৩ হাজার কেজি বেশি চা উৎপাদন হওয়ায় চলতি বছর ২০১৯ সালের চেয়েও বেশি চা উৎপাদনের আশা দেখছেন বাগানমালিকরা। অক্টোবরে দেশজুড়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে অনুকূল আবহাওয়ায় ডিসেম্বর শেষে দেশে ১০০ মিলিয়ন কেজি বা ১০ কোটি কেজি চা উৎপাদনের নতুন রেকর্ডের আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। 

সর্বশেষ ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চলতি বর্ষের (২০২১-২২ নিলাম বর্ষ) ২৩তম নিলামে চা উত্তোলন করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪৪ কেজি। এর মধ্যে ২০৫ টাকা কেজিপ্রতি গড় দামে ৮০ শতাংশ চা কিনে নেয় বিভিন্ন ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান। চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় নিলামেও ২৮ লাখ ১৯ হাজার কেজি চা বিক্রির জন্য প্রস্তাবের সম্ভাবনা রয়েছে। দুই মাস ধরে প্রতিটি নিলামেই প্রতি কেজি চা গড়ে ২০০-২০৬ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। মূলত লকডাউন উঠে যাওয়ার পর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়ায় প্রান্তিক ভোক্তা পর্যায়ে (স্ট্রিট টি স্টল) চায়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নিলাম বাজারে এর প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশী চা সংসদের চেয়ারম্যান এম শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার কারণে ২০২০ সালে দেশের চা বাগানগুলো চরম সংকটে পড়েছে। আগের বছরের চেয়ে বিক্রি প্রায় ৪৭ শতাংশ কম হওয়ায় বিনিয়োগ সংকটে উৎপাদনও কমে যায়। তবে বর্তমান সময়ে লকডাউন ও বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ায় দেশব্যাপী সব ধরনের খাত থেকে চায়ের চাহিদা বেড়েছে। বাগানমালিকরাও বাড়তি চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়িয়েছেন। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ১০০ মিলিয়ন কেজি চায়ের ধাপ পেরোতে পারবে বলে আশা করছেন তিনি। 

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৮০ হাজার কেজি। এর মধ্যে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভরা মৌসুমের চার মাসে গড়ে এক কোটি কেজির বেশি চা উৎপাদন হয়েছে। অর্থাৎ এ চার মাসেই চা উৎপাদন হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার ৬৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ বা ৫ কোটি ২৬ লাখ ৮৬ হাজার কেজি। বাকি তিন মাসে ধারাবাহিক উৎপাদন ধরে রাখতে পারলে শত মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের নতুন রেকর্ড সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন চা খাতসংশ্লিষ্টরা। 

প্রসঙ্গত, দেশে চা উৎপাদনের ভরা মৌসুম ধরা হয় জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। আবার চা ভোগের ভরা মৌসুম শুরু হয় অক্টোবরেই। অর্থাৎ শীত মৌসুমেই দেশে সবচেয়ে বেশি চা বিক্রি হয়। দেশে দুটি নিলাম কেন্দ্র (চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গল) থাকলেও চট্টগ্রাম নিলামেই সবচেয়ে বেশি চা বিক্রি হয়। নিলামে বিক্রি হওয়া চায়ের সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১ শতাংশ ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠান ও ১ শতাংশ চা বোর্ডকে প্রদানের পর বন্ডেড ওয়্যার হাউজ থেকে চা সংগ্রহ করে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এসব চা ব্লেডিং করে মোড়কজাতের মাধ্যমে সারা দেশে বিপণন করেন ব্যবসায়ীরা। দেশে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৯ থেকে ১০ কোটি কাপ চা ভোগ করে মানুষ।