নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সারা দেশের সাধারণ ছুটি চলছে ২৬ মার্চ থেকে। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে সারা দেশে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয় নির্বাহে স্টেশনের মাসিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল রেলওয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে বেতন-ভাতা ও পেনশন প্রদানে উদ্যোগী হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে দ্রুত ইএফটির মতো (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) নতুন পদ্ধতি চালু করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে সংস্থাটি। নগদে প্রদানের ক্ষেত্রে ফান্ড সংকটে বিলম্বিত হচ্ছে পেনশন। অনেক মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীর বেতন-ভাতা না পাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সেকশনভিত্তিক আয় কমে যাওয়ায় মার্চ ও এপ্রিলে বিশেষ ট্রেনে করে বেতন-ভাতা ও পেনশন পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে রেল কর্তৃপক্ষ। গণপরিবহন বন্ধের মধ্যে বিশেষ ট্রেনে বেতন পৌঁছানোর খবরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় রেলের মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি নিয়ে। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইএফটির মাধ্যমে শতভাগ বেতন-ভাতা ও পেনশন প্রদানের নির্দেশনা এলেও দ্রুত এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক রেলকর্মী বেতন, বৈশাখী ভাতা ও পেনশন পাননি বলে অভিযোগ তুলেছেন। সর্বশেষ গত কয়েক দিন চট্টগ্রামে রেলের পে অ্যান্ড ক্যাশ বিভাগে বেতন-ভাতা প্রদান করা হলেও মঙ্গলবার অর্থ সংকটে পেনশন দিতে পারেনি পে অ্যান্ড ক্যাশ বিভাগ। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা বয়স্ক এসব কর্মী সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বসে থেকেও পেনশন তুলতে পারেননি। মূলত স্টেশনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেলের অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতিদিনই পেনশন তুলতে এসে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন রেলের পেনশনধারী সাবেক কর্মীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের সাবেক এক কর্মচারী মঙ্গলবার দুপুরে পে অ্যান্ড ক্যাশ অফিসের সামনে বণিক বার্তার প্রতিবেদককে জানান, তিনি টানা দুদিন পেনশন তুলতে উপজেলা থেকে এসেছেন। কিন্তু সোমবার অনেকে পেনশন তুললেও তিনি পাননি। মঙ্গলবারও টাকা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন ক্যাশ অফিসের কর্মীরা। ঈদের আগে টাকার খুব দরকার হলেও এ বয়সে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন বলে ক্ষোভ জানিয়েছেন তিনি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সাধারণ ছুটির কারণে ক্যাশ অফিসের নিয়মিত কর্মীদের অনেকেই কাজে যোগ দেননি। ক্যাশ অফিস থেকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর ও বাংলাদেশ ব্যাংক উভয় প্রতিষ্ঠানই হাঁটা দূরত্বের হলেও অপর্যাপ্ত তহবিলের অজুহাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বয়োজ্যেষ্ঠ সাবেক রেল কর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পেনশন ভাতা তুলতে পারছেন না। ওই সময় ক্যাশ অফিসের সামনে অপেক্ষমাণ সাবেক রেল কর্মচারীদের অনেকেই পেনশন ভাতা প্রদানে রেলওয়ের অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন।

জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পে অ্যান্ড ক্যাশ বিভাগের ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, স্টেশন বন্ধ থাকলে রেলের নিজস্ব তহবিল থেকে বেতন-ভাতা ও পেনশন প্রদান করতে হয়। কিন্তু একবার অনুমোদন নিয়ে অর্থ ছাড় করার পর শেষ হয়ে গেলে আবার ব্যাংক থেকে টাকা তুলে কর্মীদের প্রদান করতে কয়েক দিন সময় লাগে। আমরা চেষ্টা করছি ঈদের আগে পেনশনারদের পাওনা পরিশোধ করতে। তবে নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি এবং কর্মী সংকটে কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে। আগামীতে এ ধরনের সমস্যা আর হবে না।

রেলের একাধিক মাঠ পর্যায়ের কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকে এখনো এপ্রিলের বৈশাখী ভাতা পাননি। প্রতি মাসের শুরুতে বিগত মাসের বেতন-ভাতা হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত (১৯ মে) এপ্রিলের বেতন পাননি। তাছাড়া আসন্ন ঈদের আগে মে মাসের বেতন-ভাতা প্রদানের কথা থাকলেও সেটা হচ্ছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। কেউ কেউ এপ্রিলের বেতন পেলেও ঈদের বোনাস পাননি। নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার পরও বেতন-ভাতা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা কর্মীদের হতাশ করেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে রেলের উল্লেখযোগ্য কর্মী কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। গুডস ট্রেন, কনটেইনার ট্রেন, জ্বালানিবাহী ট্রেন ও ১ মে থেকে বিভিন্ন রুটে চালু হওয়া পার্সেল ট্রেন পরিচালনার জন্য রেলের পরিবহন, বাণিজ্যিক বিভাগের সিংহভাগ কর্মী কাজ করছেন। বিরূপ পরিস্থিতিতে কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের পক্ষ থেকে ঝুঁকি ভাতা প্রদানের দাবি উঠলে রেলপথ মন্ত্রণালয় এসব কর্মীর তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেন। তালিকা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত রেলকর্মীদের বিশেষ প্রণোদনার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তার ওপর বেতন-ভাতা, বোনাসসহ বিভিন্ন ন্যায্য পাওনা দিতেও হচ্ছে বিলম্ব, যা রেল কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

চট্টগ্রাম পে অ্যান্ড ক্যাশ অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার প্রায় ৪৫০ জনকে পেনশন প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া সোমবার দেয়া হয়েছে ৩৫০ জনকে। তবে ফান্ড সংকটে মঙ্গলবার দেয়া হয়েছে মাত্র ১৫ জনকে। যদিও মঙ্গলবার শতাধিক সাবেক রেলকর্মী চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পেনশনের জন্য চট্টগ্রামের ক্যাশ অফিসে এসেছিলেন। ঈদের পর পেনশন প্রদানের এ জটিলতা আর থাকবে না বলে দাবি করেছেন তারা।

রেলের অ্যাকাউন্টস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু পূর্বাঞ্চল রেলের চট্টগ্রাম ডিভিশনে রেলের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বর্তমানে নগদের পরিবর্তে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া পূর্বাঞ্চল রেলের ২৭ হাজার পেনশন গ্রহীতার মধ্যে এ মাসে ইএফটির মাধ্যমে পেনশন দেয়া হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ জনের। এরই মধ্যে ডাটা এন্ট্রি হয়ে আছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ জনের। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে তারাও ইএফটির মাধ্যমে পেনশন পাবেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই পূর্বাঞ্চলের অবশিষ্ট ১৭ হাজার ৭০০ পেনশন গ্রহীতার পেনশন ইএফটির মাধ্যমে প্রদানের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে ঢাকা বিভাগ ও পশ্চিমাঞ্চল রেলের কর্মকর্তা, রেলকর্মী ও পেনশনারদের ইএফটিতে বেতন-ভাতা ও পেনশন প্রদানের কার্যক্রম শুরুই করতে পারেনি রেলওয়ে। ফলে পেনশনারসহ সারা দেশের লক্ষাধিক রেলকর্মী ও সাবেক রেলকর্মীর বেতন-ভাতা ও পেনশন প্রদানে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতিতেই আটকে আছে।