বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণকে টেকসই ও কার্যকর করতে জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাতে রাজধানীর নীলক্ষেতে আইসিএমএবি ভবনের রুহুল কুদ্দুস অডিটোরিয়ামে দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আসন্ন এলডিসি উত্তরণ: টেকসই রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা’ শীর্ষক কৌশলগত সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সভাপতিত্ব করেন আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট মো. কা্উসার আলম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, রেডিয়েন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইসিএমএবির সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুর রহমান খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে, তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ উত্তরণকে টেকসই করা। তিনি বলেন, এলডিসি সুবিধা থেকে বেরিয়ে গেলে রফতানি, ওষুধ শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তাই প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করেই উত্তরণে এগোনো উচিত।
তিনি বলেন, সরকার জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাতের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করতে কাজ করছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা দ্রুত ও সম্পূর্ণ অনলাইনে প্রদান নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী আরো বলেন, দেশের শিল্প খাতের বড় অংশ বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আইসিএমএবির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে সফল হতে হলে সুশাসন, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সক্ষমতা ও সম্ভাবনা অসাধারণ; প্রয়োজন কেবল কার্যকর বাস্তবায়ন।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, শুধু রফতানির পরিমাণ নয়, ভ্যালু অ্যাডিশন ও রিটেনশন বৃদ্ধিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি এবং স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে পোশাক শিল্পে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিল সম্প্রসারণেরও আহ্বান জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা, শুল্ক সুবিধা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের কৌশল নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং নীতি-সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াস মৃধা। সঞ্চালনা করেন আইসিএমএবির সাবেক প্রেসিডেন্ট আরিফ খান। অনুষ্ঠানের শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইসিএমএবির সেক্রেটারি মনজুর মো. সাইফুল আজম।
সংলাপে বক্তারা অভিন্নভাবে মত দেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও, এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কাঠামোগত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর।










