সোমালীয় জলদস্যুদের হাতে ৩১ দিন জিম্মি থাকার পর বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ মুক্ত হয়েছে। জাহাজটির ২৩ জন বাংলাদেশী নাবিকসহ জাহাজটি দুবাইয়ের পথে আছে। ১৯ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফেরার পর নাবিকরাই সিদ্ধান্ত নেবেন তারা বিমানে নাকি জাহাজে দেশে ফিরবেন।

বাংলাদেশী পতাকাবাহী এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের মালিক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামভিত্তিক কেএসআরএম গ্রুপ। গ্রুপটির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মালিকানায় থাকা এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটি বাংলাদেশ সময় শনিবার (১৩ এপ্রিল) দিবাগত রাত ৩টায় জলদস্যু মুক্ত হয়ে দুবাইয়ের পথে যাত্রা শুরু করে। জাহাজটি দুবাইয়ে পৌঁছবে ১৯ এপ্রিল। সেখানে নাবিকদের শারীরিক পরীক্ষা, জাহাজটিতে থাকা পণ্য অফলোড করে প্রাথমিক ইন্সপেকশন শেষে নতুন কার্গো নিয়ে বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে এসআর শিপিংয়ের।

কেএসআরএম গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৪ বছর আগে সোমালীয় জলদস্যুদের হাতে আটক কেএসআরএম গ্রুপের এমভি জাহানমণি জাহাজটি উদ্ধার করতে তিন মাসের বেশি সময় (১০০ দিন) লেগেছিল। ফলে অনেক নাবিকের ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। এ কারণে ওই জাহাজের নাবিকদের সরাসরি দেশে নিয়ে আসা হয়েছিল। আবদুল্লাহ জাহাজটি মাত্র ৩১ দিনের মধ্যে উদ্ধার করায় নাবিকদের সুযোগ রয়েছে বিমানে কিংবা জাহাজে দেশে ফেরার। দুবাইয়ে এমভি আবদুল্লাহ পৌঁছার পর সব নাবিকের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবে এসআর শিপিং।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার মিজানুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৯ এপ্রিল এমভি আবদুল্লাহ দুবাইয়ে আল হামরিয়া বন্দরে পৌঁছবে। সেখানে মোজাম্বিক থেকে নেয়া ৫৫ হাজার টন কয়লা খালাসের পর জিম্মি জাহাজের নাবিকদের আন্তর্জাতিক বেশকিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে কয়েক দিন সময় লাগবে। তার পরই নাবিকরা দেশে কবে দেশে ফিরবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এক্ষেত্রে বিমানে নাকি জাহাজে করে নাবিকরা বাংলাদেশে ফিরবেন সেটি চূড়ান্ত হয়নি।’ নাবিকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ বলছে, দুবাইয়ে যাওয়ার পর নাবিকরা জাহাজ থেকে সাইন অফ করবেন। তবে জাহাজটি নতুন রুটে চালাতে দ্বিতীয় কোনো নাবিক গ্রুপ রেডি করা হয়নি। অভ্যন্তরীণ ক্ষতির পরিমাণ বেশি হলে জাহাজটিকে মেরামতে চীনে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার ক্ষতির পরিমাণ সামান্য কিংবা কোনো ক্ষতি না হলে সরাসরি বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। এক্ষেত্রে দুবাই থেকে পণ্য লোড করে পুরনো নাবিক কিংবা নতুন নাবিকদের নিয়েই এমভি আবদুল্লাহ দেশে ফিরবে বলে জানিয়েছেন তারা।

এর আগে আজ রোববার দুপুরে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে কেএসআরএম গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জিম্মিদের কাছ থেকে জাহাজ ও নাবিকদের মুক্ত করার বিষয়ে গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ‘জলদস্যুরা জাহাজটি দখল করার পর নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। ভারতীয় ও ইউকের যুদ্ধজাহাজ জিম্মি বাংলাদেশী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ উদ্ধারে অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে নাবিকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে।

শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ‘ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ এমভি আবদুল্লাহর পিছু নেয়ার পর সরকারকে দ্রুত বিষয়টি অবহিত করি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মাধ্যমে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে আমরা জাহাজ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক বল প্রয়োগের বিষয়টি নাকচ করে দিতে সক্ষম হই।’ এজন্য প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান শাহরিয়ার জাহান রাহাত।

তিনি বলেন, ‘মালিক পক্ষ হিসেবে সরাসরি জলদস্যুদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করিনি। আন্তর্জাতিক যেসব প্রতিষ্ঠান এসব বিষয় নিয়ে এক্সপার্ট তাদের সহায়তা নিয়েছি। এজন্য তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে জাহাজসহ নাবিকদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।’

জাহাজের নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়ে বিভিন্ন সমালোচনার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ‘এমভি আবদুল্লাহ আন্তর্জাতিক জলসীমার ২০০ নটিক্যাল মাইল ঝুঁকিপূর্ণ। এর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করলে জাহাজে আর্মড গার্ড রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আমাদের জাহাজ ৬০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি দূরত্ব দিয়ে ভারত মহাসাগরে চলছিল। যেখান থেকে আমাদের জাহাজ জলদস্যুরা আক্রমণ করে, সেখানে গত ৯-১০ বছরে পাইরেসির কোনো রেকর্ড নেই। মূলত হুতি বিদ্রোহীদের দমনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রদানকারী বাহিনীগুলো কিছুটা সরে যাওয়ায় সোমালীয় জলদস্যুরা সে সুযোগ নিয়েছে। এখন ওই অঞ্চলেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে কেএসআরএম গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেরুল করীম বলেন, ১৩ বছর আগে আমাদের প্রতিষ্ঠানের আরেকটি জাহাজ ‘‘এমভি জাহানমণি’’ সোমালীয় জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়েছিল। তখন জিম্মি উদ্ধার সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা কম ছিল। এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি হওয়ার পর অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সঠিক পন্থায় যোগাযোগ রক্ষা করে আলোচনা চালিয়ে গেছি। জাহাজটি জিম্মি হওয়ার পর থেকে জাহাজের ভিসেটের মাধ্যমে জাহাজটির অবস্থানসহ সব তথ্য পর্যবেক্ষণে রেখেছি।’

মেহেরুল করীম বলেন, ‘জাহাজ পাহারায় থাকা জলদস্যুদের কমান্ডারের ইংরেজি জানা একজন সহকারী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যোগাযোগের পর থেকেই আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল জাহাজের নাবিকরা সুস্থ আছেন কিনা সেটি নিশ্চিত করা। জাহাজ জিম্মি হওয়ার পর থেকে উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার বিভিন্ন আইন, নিয়ম ও নির্দেশনা প্রতি মুহূর্তে প্রতিপালন করে জিম্মি নাবিকদের উদ্ধার করা হয়েছে। এজন্য উদ্ধার প্রক্রিয়ার অনেক বিষয় প্রকাশ্যে বলা যাচ্ছে না।

কেএসআরএম গ্রুপের কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে আরো বলেন, ‘নাবিকরা কেমন আছে সে বিষয়টি নিশ্চিত হতে প্রতিদিন সেটির ভিডিও নেয়া হতো। সর্বশেষ দুইদিন আগে এসআর শিপিংয়ের সঙ্গে জলদস্যুদের সমঝোতা হয়। এরপর শনিবার দিবাগত রাত ৩টায় এমভি আবদুল্লাহর পাহারায় থাকা ৬৫ জলদস্যু জাহাজটি ছেড়ে চলে যায়। এরপর ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করে “‍তারা মুক্ত” ঘোষণা দিলে এমভি আবদুল্লাহকে নিয়ে দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।’

উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ সোমালীয় উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে বাংলাদেশী মালিকানাধীন এমভি আবদুল্লাহকে ২৩ নাবিকসহ জিম্মি করে জলদস্যুরা। এর প্রায় আটদিন পর ২০ মার্চ মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জলদস্যুরা। মূলত মুক্তিপণ আদায়ের জন্যই আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজগুলো জিম্মি করে সোমালীয় জলদস্যুরা।