প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ডিসেম্বরে নির্বাচন চায় কেবল একটি দল, সব দল নয়। গতকাল জাপানের টোকিওতে নিক্কেই ফোরামে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা পুনর্ব্যক্ত করেন যে তার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই এবং নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশ গড়তে জাপানসহ এশিয়ার দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা জনগণকে বলছি, নির্বাচন এ বছরের শেষে ডিসেম্বরে অথবা সর্বোচ্চ আগামী বছরের জুনে অনুষ্ঠিত হবে।’ নির্বাচন কখন হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে সংস্কার কতটা সম্পন্ন করা হচ্ছে তার ওপর উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যদি দেশকে আগের অবস্থায়, প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের অবস্থায় রেখে যেতে চাই, তাহলে ডিসেম্বরে নির্বাচনের কথা বলতে পারি। আমরা যদি খুব তড়িঘড়ি করি, কিছু সংস্কার করি এবং অন্যান্য সংস্কারের জন্য অপেক্ষা করতে পারি, তাহলে আমরা এটা (নির্বাচন) ডিসেম্বরে করতে পারি। তবে আমাদের যদি ভালো সংস্কার দরকার হয়, তাহলে আমাদের আরো ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে।’ কিন্তু কিছু ব্যক্তি সংস্কার রেখে নির্বাচন শেষ করতে বলছেন উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দল নয়, শুধু একটি দল এটা বলছে।’
এর আগে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অনুষ্ঠিত ৩০তম নিক্কেই ফোরামে ‘ফিউচার অব এশিয়া’র উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক আস্থা এখন হুমকির মুখে। জাতির মধ্যে, সমাজের অভ্যন্তরে, এমনকি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আস্থা হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ব ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। আমরা এক গভীর অনিশ্চিত সময় পার করছি। আমরা এমন একটি বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করছি যেখানে শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে, উত্তেজনা বাড়ছে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সবসময় নিশ্চিত থাকছে না।’
এশিয়া ও তার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে এবং শান্তি দিন দিন অধরা হয়ে উঠছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন, গাজা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় যুদ্ধ ও মানবসৃষ্ট সংঘাত হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ এক নির্মম রূপ নিয়েছে এবং সাম্প্রতিক ভূমিকম্প দেশটির গভীর মানবিক সংকটকে আরো অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যয়বহুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে আমরা কোটি কোটি টাকা যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করছি, অথচ লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে বা ন্যূনতম চাহিদার জন্য লড়াই করছে।’ অধ্যাপক ইউনূস যুদ্ধবিরতির জন্য উভয় দেশের নেতাদের ধন্যবাদ জানান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশে শাসন ব্যবস্থার সাম্প্রতিক পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গত বছর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে একটি পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা আমাদের জনগণের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে, ন্যায়বিচার, সমতা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছি।’
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এবং মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, কিন্তু আমাদের সম্মিলিত শক্তিও বিশাল। এ বাস্তবতায় আমি বিশ্বাস করি এশিয়ার সামনে একটি সুযোগ, এমনকি একটি দায়িত্ব রয়েছে ভিন্ন পথ দেখানোর: শান্তির, সংলাপের, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের। শুধু সংখ্যাগত নয়, মানুষের কল্যাণ, আস্থা ও আশার উন্নয়ন। ‘তিনটি শূন্য’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ—এ তত্ত্ব উপস্থাপন করে ড. ইউনূস বলেন, ‘এটি কোনো স্বপ্ন নয়, বরং একটি দিকনির্দেশনা।’
জাইকা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক: নিক্কেই ফোরাম সম্মেলনের ফাঁকে গতকাল জাইকা প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে বৈঠক করেন ড. ইউনূস। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগে (এমআইডিআই) সমর্থন জোরদার করার জন্য জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির প্রতি (জাইকা) আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে অঞ্চলটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরের প্রবেশাধিকারকে কাজে লাগিয়ে আমরা গভীর সমুদ্রবন্দর, মহাসড়ক এবং রেলপথ তৈরি করছি, যা এমআইডিআই অঞ্চলকে নেপাল, ভুটান এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করবে।’
ড. তানাকা এমআইডিআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাইকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন, তবে তিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। উত্তরে অধ্যাপক ইউনূস এমআইডিআই প্রকল্প তদারকির জন্য একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নিয়োগ এবং জাইকা ও অন্যান্য সম্ভাব্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশকে গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণে যুক্ত হতে হবে বলেও জানান ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিবেশী দেশগুলোর মৎস্যজাহাজ আমাদের জলসীমা ব্যবহার করে, অথচ আমাদের ট্রলারগুলো গভীর সমুদ্রে চালানোর জন্য যথেষ্ট বড় নয়। আমরা যদি সক্ষমতা তৈরি করি তাহলে সেই মাছগুলো প্রক্রিয়াজাত করে রফতানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করা যাবে।’ ড. তানাকা মন্তব্য করেন, সম্ভবত এ প্রথম তিনি কোনো বাংলাদেশী নেতার মুখে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের উদ্যোগ সম্পর্কে শুনলেন।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা মানবিক সহায়তা বৃদ্ধিতে জাইকার সমর্থন কামনা করেন। ড. তানাকা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় জাইকা অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এক লাখ শ্রমিক নেবে জাপান: ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ শ্রমিক নিয়োগের কথা জানিয়েছেন জাপানি কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা। গতকাল টোকিওতে ‘বাংলাদেশ সেমিনার অন হিউম্যান রিসোর্সেস’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জাপানে বাংলাদেশীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে।’
সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টা দুটি সমঝোতা স্মারকের সাক্ষী হন। প্রথমটি বাংলাদেশের ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি) ও কাইকম ড্রিম স্ট্রিটের (কেডিএস) মধ্যে, যার একটি জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগ; দ্বিতীয়টি বিএমইটি ও জাপানের ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কো-অপারেটিভস (জাপানে ৬৫টির বেশি কোম্পানির একটি ফেডারেশন) এবং জেবিবিআরএর (জাপান বাংলা ব্রিজ রিক্রুটিং এজেন্সি) মধ্যে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ অনুষ্ঠান একটি দ্বার উন্মোচনের প্রতীক।’ তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ, যার অর্ধেকই ২৭ বছরের নিচে। সরকারের কাজ হলো তাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া।’
শিজুওকার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন সমবায়ের তত্ত্বাবধায়ক সংস্থার প্রতিনিধি পরিচালক মিতসুরু মাতসুশিতা বলেন, ‘অনেক জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশীদের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছে এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’
এনবিসিসি চেয়ারম্যান মিকিও কেসাগায়ামা স্মরণ করেন যে প্রায় ১৪ বছর আগে অধ্যাপক ইউনূস জাপানে এসেছিলেন এবং ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীদের সহায়তার গল্প বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফেডারেশন তরুণ ও দক্ষ শ্রমিকের জন্য বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে দেখছে। তারা উভয় দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। আগামী পাঁচ বছরে আমরা এক লাখ বাংলাদেশী শ্রমিককে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।’
মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ: নিক্কেই ফোরাম ‘ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনের ফাঁকে মাহাথির প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের দীর্ঘকালের বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ করেন। মাহাথিরকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি আপনাকে শততম জন্মদিনের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’ প্রায় ৪০ মিনিটব্যাপী আলোচনায় তারা পারস্পরিক আগ্রহের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, যার মধ্যে ছিল বাংলাদেশের আসিয়ান সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। ড. ইউনূস মাহাথিরকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান।










