স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম চার বছরে (১৯৭২-৭৫) মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অভিবাসন ছিল অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক। সে সময় চাকরিদাতারা এসে বিচ্ছিন্নভাবে কর্মী নিত। তবে পন্থাটি অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় সে সময় অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যও হতো অনেক বেশি। এ অবস্থায় অভিবাসী কর্মীর সুরক্ষায় ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিএমইটি অভিবাসনসংশ্লিষ্ট সেবাদাতা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সংস্থাটির সেবা গ্রহণ করছেন অভিবাসী কর্মী, চাকরিপ্রত্যাশী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটিতে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় স্তম্ভ হয়ে উঠেছে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এ অর্জনের পেছনে বড় কৃতিত্ব দেয়া হয় বিএমইটিকে।

বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে। এর পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রেখেছে অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বর্তমানে এ রিজার্ভ দিয়ে দেশের প্রায় এক বছরের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। গত বছর করোনার অভিঘাতে থমকে দাঁড়িয়েছিল প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। যদিও অব্যাহত ছিল অভিবাসীদের রেমিট্যান্সপ্রবাহ। সংকটকালীন ওই সময়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় অবদান রেখেছেন বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসীরা। রেমিট্যান্সপ্রবাহের এ অবস্থান তৈরিতে কৃতিত্বের অন্যতম বড় দাবিদার বিএমইটি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএমইটির যাত্রা হয়েছিল বৈদেশিক কর্মসংস্থানে অভিবাসী কর্মী নিয়োগ ও প্রেরণের লক্ষ্য নিয়ে। বর্তমানে সংস্থাটি বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নিয়োগ প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান, অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া দেশের কর্মোপযোগী জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।

যদিও বহির্বিশ্বে অভিবাসনের শুরুটা এমন মসৃণ ছিল না। স্বাধীনতার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৪১ লাখ নতুন চাকরি তৈরির পরিকল্পনা ছিল। এ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম অভিবাসন শুরু হয়ে যায়। প্রথম কয়েক বছর অনানুষ্ঠানিক পন্থায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় চাকরি নিয়ে অভিবাসী হয়েছিলেন অনেকেই। তবে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অভিবাসী কর্মীদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল। পরে ১৯৭৬ সালে কাজ শুরু করে বিএমইটি। প্রথম চার বছরে (১৯৭৬ থেকে এপ্রিল ১৯৭৯) বিএমইটির মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী হন ৫৮ হাজার ১০০ জন বাংলাদেশী, যা ওই সময় মোট জনশক্তি রফতানির ৩৪ শতাংশ। ওই চার বছরে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে অভিবাসী হয়েছিলেন মাত্র ৮ শতাংশ। বাকি ৫৮ শতাংশ বাংলাদেশী কর্মী সে সময় মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী হয়েছিলেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরে বিএমইটির মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মী গিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই)। ১৯৭৬ সালে ইউএইতে গিয়েছিলেন ১ হাজার ৯৮৯ জন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। ১৯৭৬ সালে বিএমইটির মাধ্যমে দেশটিতে গিয়েছিলেন মাত্র ২১৭ জন। সব মিলিয়ে বিএমইটির মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে ১৯৭৬ সালে অভিবাসী হয়েছিলেন মোট ৬ হাজার ৮৭ জন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈধ ও অবৈধ বাংলাদেশী প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই রয়েছেন প্রায় ২০ লাখ।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ১৯৭৬ সালে অভিবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার বা ৩৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে এসে পৌঁছেছে অনন্য উচ্চতায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেশি। ফেব্রুয়ারিতেও আগের চেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। রেমিট্যান্সের এ উচ্চপ্রবৃদ্ধিই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী হওয়া বাংলাদেশীদের ৮২ শতাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল নিম্নমাধ্যমিকের নিচে। এ কারণে তারা যেতেন মূলত অদক্ষ কর্মী হিসেবে। বেতন-ভাতাও ছিল অনেক কম। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সে সময় সরকার দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়ার ওপর জোর দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসী কর্মীরা বিপুল অংকের রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে যেমন অবদান রাখছেন, তেমনি শক্তিশালী করে চলেছেন গ্রামীণ অর্থনীতির অবকাঠামোও। দেশের যেসব এলাকা থেকে প্রবাসীরা বেশি প্রবাসে গিয়েছেন সেসব এলাকার জীবনযাত্রার পরিবর্তন দেখলেই বিষয়টি বোঝা যায়। প্রবাসীরা তাদের আয়ের বড় একটা অংশ দেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠান। এ অর্থ যে কেবল তাদের পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটায় তা নয়, নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বেশি অংশ ব্যয় হয় দালানকোঠা নির্মাণ, ফ্ল্যাট বা জমি কেনায়। প্রবাসী অধ্যুষিত জেলার মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু ব্যয়ের ক্ষমতাও অন্য জেলার মানুষের চেয়ে বেশি। এর প্রমাণ পাওয়া যায় কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল ও নোয়াখালীতে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন এসব জেলা থেকেই।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাধীনতার আগ থেকেই মূলত দুটি জেলা থেকে লন্ডন ও দুবাই যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলের লোকজন যেতেন লন্ডনে। চট্টগ্রামের লোকজন যেতেন দুবাইয়ে। তবে এ সংখ্যাটা ছিল খুবই কম। নব্বইয়ের দশকে মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অভিবাসন শুরু হলেও তা ব্যাপক মাত্রা পায় ২০০০ সালের পর থেকে। অভিবাসী কর্মীদের কারণে বহির্বাণিজ্য অর্থায়নের সবচেয়ে বড় উেস পরিণত হয়েছে রেমিট্যান্স। এমনকি বেশকিছু দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়েও আমাদের রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেশি।

তিনি বলেন, অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকেও গতিশীল করছে। আবার এসব শ্রমিক বিদেশে না গেলে তা দেশের শ্রমবাজারে চাপ সৃষ্টি করে মজুরি হার কমিয়ে দিত। অভিবাসী শ্রমিকদের এ অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে হলে অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। এছাড়া দক্ষ কর্মী পাঠানোর দিকে নজর দিতে হবে।