সাধারণত একটি বড় বাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ১২ বছর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস নির্মাতা কোম্পানিগুলো তা ১০-১৫ বছর পর্যন্ত ধরে। কিন্তু এ আয়ুষ্কাল পূর্ণ করতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) কোনো বাসই। কেনার দু-চার বছরের মধ্যেই অচল হয়ে ডিপোয় স্থান করে নেয় সংস্থাটির অধিকাংশ বাস।
গত এক দশকে ১ হাজার ৬৬৪টি বাস কিনেছে বিআরটিসি। এর মধ্যে ৬০০টি এসেছে গত বছর। ভারত থেকে কেনা নতুন এসব বাসে নিয়মিতই বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। বাকি ১ হাজার ৬৪টি বাসের মধ্যে প্রায় ৪৫০টি অচল হয়ে পড়ে আছে, যেগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
নিম্নমানের বাস সংগ্রহ, ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা, চালক-শ্রমিকদের অদক্ষতা ও অবহেলা এবং প্রয়োজনীয় যত্নের অভাবেই আয়ুষ্কাল পেরোনোর আগেই বিআরটিসির বাসগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, বিআরটিসির বাসগুলো দ্রুত নষ্ট হওয়ার জন্য সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই দায়ী। প্রথমত, বিআরটিসিতে যারা শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন, তাদের বেশির ভাগই আগে সংস্থাটির সঙ্গে তেমনভাবে সম্পৃক্ত নন। এ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিআরটিসির বাস ঠিক রাখার বদলে নতুন নতুন বাস কেনায় আগ্রহ বেশি। অন্যদিকে বিআরটিসির অনেক বাস চালকদের কাছে চুক্তিভিত্তিক ছেড়ে দেয়া হয়। চালকরা বাসের নিরাপত্তার চেয়ে লাভটাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এসব কাজের জন্য সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো ধরনের জবাবদিহিও করতে হয় না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে বিআরটিসি যত ভালো মানের বাসই কিনুক না কেন, সেগুলো বেশিদিন টিকবে না।
২০১০ সালে চীন থেকে ২৭৫টি একতলা সিএনজিচালিত বাস কেনে বিআরটিসি। এতে ব্যয় হয় ১১৪ কোটি টাকা। বাসগুলোর আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর ধরা হলেও বর্তমানে সচল আছে মাত্র ১২২টি বাস। এরপর ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২৫৫টি এসি ও নন-এসি বাস কেনে বিআরটিসি। এসব বাসের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র ১২২টি।
ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি-১) মাধ্যমে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালে কেনা হয় ২৯০টি দ্বিতল ও ৫০টি আর্টিকুলেটেড বাস। দ্বিতল বাসগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ১২ বছর ও আর্টিকুলেটেড বাসগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা আছে ১৫ বছর। আট বছর যেতে না যেতেই দ্বিতল ৫৫টি বাস অচল। অচল আর্টিকুলেটেড বাসের সংখ্যা ১২। সচলগুলো হালকা ও ভারি মেরামতের মধ্যেই থাকে বেশির ভাগ সময়। একই প্রকল্পে ২০১৩ সালে কেনা হয় ৮৮টি এসি বাস, যার মধ্যে বর্তমানে সচল আছে ৭০টি।
গত বছর এলওসি-২-এর মাধ্যমে কেনা অশোক লেল্যান্ডের এসি ও দ্বিতল এবং টাটা কোম্পানির কাছ থেকে কেনা ৬০০ বাসের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাস্তায় নামানোর পর থেকেই নানা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। ‘ত্রুটিপূর্ণ’ এসব বাস কেনাকাটায় কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কিনা, তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে বিআরটিসি।
সুইডেন, জাপান, চীন, কোরিয়া ও ভারত—এখন পর্যন্ত এসব দেশের কোম্পানি থেকেই বাস কিনেছে বিআরটিসি। সবচেয়ে বেশি কেনা হয়েছে ভারতের টাটা ও অশোক লেল্যান্ডের কাছ থেকে। তবে কোনো বাসই কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পর্যন্ত নিতে পারেনি সংস্থাটি।
বিআরটিসির বাস পজিশনের ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে বণিক বার্তা। এতে দেখা গেছে, টাটা, টিসি, অশোক দ্বিতল (পুরনো), অশোক
দ্বিতল (২০১২), সিএনজি
(চায়না), সিএনজি
(ফাও), দাইয়্যু
এসি, দাইয়্যু নন-এসি, অশোক এসি (পুরনো), ভলভো,
হিনো, আর্টিকুলেটেড, অশোক দ্বিতল (নতুন), অশোক
এসি (নতুন), টাটা
(নতুন), মিনিবাস
ও অন্যান্য মডেলের কয়েকটি বাস রয়েছে সংস্থাটির।
সব মিলিয়ে বর্তমানে বিআরটিসির বহরে থাকা বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৮২২। এর মধ্যে সচল আছে ১ হাজার ১৭১টি। দীর্ঘমেয়াদি লিজে দেয়া আছে ৯১টি। ভারি মেরামতে আছে ২৭৯টি। ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় আছে ২৮১টি। বহরে থাকা বাসের মধ্যে ৩৬ শতাংশই বসে আছে।
বিভিন্ন সময়ে বিদেশী ঋণে কেনা হয়েছে বিআরটিসির এসব বাস। তবে ঋণ পরিষেবা দায় (ডিএসএল) পরিশোধে সংস্থাটি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। গত ১০ বছরে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকার বাস ও ট্রাক কিনেছে বিআরটিসি। অথচ ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ডিএসএল পরিশোধ করেছে মাত্র ৭ কোটি টাকা। বিআরটিসি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ঋণের টাকা সরকারকে দিতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. এহছানে এলাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবস্থাপনায় আমাদের বিভিন্ন দুর্বলতা ছিল, আমরা সেখানে পর্যবেক্ষণ বাড়িয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ডিপোর কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।









