এ সংকটের সবচেয়ে বড় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নারীরা। নিরাপদ পানির সন্ধানে কক্সবাজার, খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলে বসবাসকারী নারীদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে বাড়তি কায়িক শ্রমের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন নারীরা। এছাড়া লবণাক্ত পানির কারণে প্রজননক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়ছে।
গতকাল ন্যাশনাল কমিউনিটি বেইজড অর্গানাইজেশন (সিবিও) সামিট ২০২৬-এর ‘বাংলাদেশে জলবায়ু ন্যায়বিচার, লিঙ্গসমতা ও সহনশীল সম্প্রদায় গড়ে তোলা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এসব তথ্য উঠে আসে। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, অক্সফাম ইন বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ান এইড আয়োজিত সামিটে কক্সবাজার, খুলনা ও সাতক্ষীরার পাঁচটি উপকূলীয় উপজেলার মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়, ন্যাশনাল কমিউনিটি বেইজড অর্গানাইজেশনের আওতায় কক্সবাজারের চকরিয়া ও মহেশখালী, খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলা, বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসন এবং নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় কাজ করে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স। সেখানে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে নিরাপদ সুপেয় পানির সংকটের চিত্র উঠে আসে। এসব অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবার সুপেয় পানির জন্য সংগ্রাম করছে। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এ সংকট তীব্র হচ্ছে। ফলে দূরবর্তী টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব এলাকায় পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে হয় নারীদের। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ও অক্সফামের পর্যবেক্ষণ মতে, নিরাপদ পানির জন্য উপকূলীয় নারীদের প্রতিদিন গড়ে ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার হাঁটতে হয়, যা তাদের অতিরিক্ত শ্রম ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে।
তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জলবায়ুর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নারীরা। যেকোনো দুর্যোগে নারীদের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয়, বিশেষ করে খাদ্যের জোগান ও নিরাপদ পানির সংস্থানে। দুর্যোগের সময় অবৈতনিক পরিচর্যা ও পানি সংগ্রহের দায়িত্ব বেড়ে যায়। উপকূলের বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা জীবিকা, স্বাস্থ্য এবং প্রজননস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া প্রতিটি দুর্যোগের পর সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বাড়ে। উপকূলীয় নারীরা জলবায়ু বৈষম্যের পাশাপাশি সহিংসতারও শিকার। মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে ৭০ শতাংশ নারী সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অবৈতনিক বা অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত এ অঞ্চলের প্রায় ৯৬ শতাংশ নারী।
এ বিষয়ে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের পরিচালক (অনুষ্ঠান ও পরিকল্পনা) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপকূলে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দূরের বা সরকারি পানি সরবরাহের প্রোগ্রামগুলোতে যেতে হয়। যার কারণে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আবার দীর্ঘ পথ কলসি কোমরে করে আনতে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া উপকূলের লবণাক্ততা নারীদের প্রজননক্ষমতায় সমস্যার সৃষ্টি করে। এখানে সরকারের পদক্ষেপ জরুরি। সরকারিভাবে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে উপকূলের নারীদের গুরুত্ব দিতে হবে।’
সামিটে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীজুড়ে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন ধরনের তহবিল রয়েছে, কিন্তু আমরা এখনো সেগুলোর পুরো সুবিধা নিতে পারছি না। তাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য পৃথিবীর বিভিন্ন গ্রিন ফান্ড—গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে শুরু করে এলডিসিভিত্তিক অন্যান্য তহবিল—এসবের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সেগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসা। যাতে পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে সেগুলো ব্যবহার করা যায়।’










