বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি সংকট নয়, বরং অতিরিক্ত মজুদ প্রবণতাই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
আজ সোমবার সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশ আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক আমদানি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সংসদে দেয়া বক্তব্যে তিনি জানান, বর্তমানে দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন, যা ৩০ মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে। একই সময়ে ৪১ দিনে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হলেও মজুদ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া ঈদুল ফিতর ঘিরে সরকার জ্বালানি সরবরাহ আরো বাড়িয়েছে, যাতে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্ন থাকে। ২০২৫ সালের মার্চের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে ২০২৬ সালের মার্চে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাস্তব চাহিদা সেই হারে না বাড়লেও জনমনে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি করছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, একটি মোটরসাইকেল যেখানে সাধারণত ৫ লিটার অকটেন নেয়, সেখানে বর্তমানে অনেকেই দিনে কয়েকবার এসে মোট ১৫ থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত সংগ্রহ করছেন।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের মার্চে যেখানে একটি ফিলিং স্টেশনে দৈনিক গড়ে ৫ হাজার ৪০০ লিটার অকটেন বিক্রি হতো, সেখানে ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ৬২০ লিটারে পৌঁছেছে—যা প্রায় ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
তিনি বলেন, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৩ শতাংশই ডিজেল, আর অকটেন ও পেট্রোলের অংশ যথাক্রমে প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ। ফলে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের চিত্র প্রকৃত সংকট নয়, বরং অতিরিক্ত মজুদ প্রবণতার প্রতিফলন।
তিনই জানান, অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে এরই মধ্যে ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ৫৩টি মামলা দায়ের, প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। সরকার এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে এবং দেশীয় উৎস থেকে আরো ৩০ হাজার টন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দুই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে জানানো হয়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় প্রতি লিটার প্রায় ১৯৮ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। অকটেনের ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। এ খাতে সরকারের মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা।
বক্তব্যে তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ক্রয় ও মজুদ থেকে বিরত থাকতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং অবৈধ মজুদ ও পাচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, সংকটের সময় রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব জনগণের পাশে দাঁড়ানো। তবে এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণের সহযোগিতাও অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেকোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।










