এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভাগীয় বা জেলা শহরের তুলনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উপজেলা, গ্রাম, চর ও দুর্গম এলাকার প্রতিষ্ঠানই এতে বেশি। বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা এ তালিকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই অবস্থান দেশের উত্তরাঞ্চল, হাওর-চরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকায়।
শূন্য পাসের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠান ২২৬টি। এর বাইরে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তালিকায় চোখ রাখলেই প্রান্তিক জনপদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি স্পষ্ট হয়। নওগাঁর মান্দা, পোরশা, পত্নীতলা ও সাপাহার; রাজশাহীর বাঘা, বাগমারা ও তানোর; সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও উল্লাপাড়া; রংপুরের পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও তারাগঞ্জ—এসব উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শূন্য পাসের তালিকায় রয়েছে।
শুধু উপজেলা বা গ্রামীণ এলাকা নয়, তালিকায় রয়েছে চরাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানও। ঈশ্বরদীর চর মিরকামারি মঠালপাড়া দাখিল মাদরাসা, জামালপুরের সরিষাবাড়ীর চর সরিষাবাড়ী বালিকা দাখিল মাদরাসা এবং সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের চর তেংরাইল আদর্শ দাখিল মাদরাসা থেকে এবার কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল কম—কোথাও চারজন, কোথাও নয়জন, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে মাত্র দুজন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের শূন্য পাসের তালিকায় মোট আটটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত চারটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। মহালছড়ি, উড়িরচর, জারুলছড়ি হেডম্যানপাড়া ও তারাবানিয়া এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যাও ছিল অনেক কম।
প্রান্তিকতার আরেকটি দিক উঠে এসেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যায়। শূন্য পাসের তালিকায় এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার কোথাও একজন, কোথাও দুজন বা তিনজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। প্রত্যন্ত ও তুলনামূলকভাবে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা অনেক এলাকায় শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকার চিত্রটি স্থানীয় শিক্ষা অবকাঠামো ও শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত দেয়। এসব এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখা, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি এবং পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
এর পেছনে শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পদ, অবকাঠামো ও শিক্ষকের গুণগত মানের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অঞ্চলভেদে কোচিং ও গাইড বইনির্ভরতার পার্থক্য রয়েছে। কোথাও শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বেশি পাচ্ছে, আবার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষার্থীর সেই সুযোগ সীমিত। ফলে একই জাতীয় পাঠ্যক্রম ও একই পরীক্ষার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির পরিবেশ এক থাকছে না।
শূন্য ফলের তালিকায় উত্তরাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার একাধিক দাখিল মাদরাসার কোনো শিক্ষার্থী কৃতকার্য হতে পারেনি। একই চিত্র দেখা যায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, ও জামালপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
শহরের বাইরে কোনো কোনো জনপদে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষার প্রধান ভরসা। সেখানে একটি ব্যাচের সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে শুধু পরীক্ষার ফলই খারাপ হয় না, প্রশ্নের মুখে পড়ে ওই এলাকার শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশও। তাই কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নেই, কোথায় যোগ্য শিক্ষক থাকলেও নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না, কোথায় শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও সামাজিক বাধা রয়েছে, আর কোথায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দুর্বলতা—এসব আলাদা করে চিহ্নিত করা জরুরি।
দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতি বছর বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার কথা বললেও বাস্তবে এসব উদ্যোগের প্রভাব এখনো সীমিত। ফলে একটি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর দুর্বল ফল করলেও তার একাডেমিক মানোন্নয়নে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তবে এবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বোর্ড পর্যায় থেকে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম হোসেন আলী বলেন, ‘শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হবে। প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক দুর্বলতা কিংবা শিক্ষকদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৩১২টি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। বিষয়টি নিবিড়ভাবে গবেষণা করে দেখা দরকার। গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয় হওয়ায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করবে না, এটি হতে পারে না। কেন এসব বিদ্যালয়ে এমন ফল হয়েছে, তা তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তবে এটিও ঠিক যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শহর ও গ্রামের মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য রয়েছে। এটি দূর করার জন্য যথাযথ বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কার্যকর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের যথাযথ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’










