দেশব্যাপী চলমান হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে ধীরগতি। এতে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে কিছু পরিবহন রাস্তায় বের হলেও সেখানে খরচ বেড়েছে ট্রিপপ্রতি ১০-১২ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, অঞ্চলভেদে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দামে নতুন করে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা।

তারা বলছেন, এমনিতে ডলার সংকট, টাকার বিপরীতে ডলারের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তা উসকে দিয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে দেশের রাজনৈতিক সংকট। এ অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে থাকলে দেশব্যাপী ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেল, ডালসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম গত এক মাসের তুলনায় নিম্নমুখী হলেও সরবরাহ সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর সুফল মিলছে না। টানা হরতাল-অবরোধের কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজার নতুন সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

দেশে নিত্য ভোগ্যপণ্যের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। ভোজ্যতেল, চিনি, গম, ডাল, কাঁচা মসলা ও শুকনো মসলা এমনকি চাল পর্যন্ত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম দিয়েই অধিকাংশ ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়। তাছাড়া সীমান্তপথ দিয়ে ভারতীয় পণ্যগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে সারা দেশের বিভিন্ন মোকামে পৌঁছে। অবরোধের কারণে যানবাহনের ওপর নাশকতার শঙ্কায় ঘোষণা সত্ত্বেও চলাচল করছে কম। পরিবহন মালিকদের অনেকেই ঝুঁকি এড়াতে অবরোধ কিংবা হরতালের সময়ে যানবাহন বের করছে না। এ কারণে সরবরাহ ঘাটতি না হলেও পরিবহন সংকটের কারণে দেশে ভোগ্যপণ্যের সাপ্লাই চেইন অনেকটাই ভেঙে পড়ছে। যা প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা উৎস স্থান থেকে সংগ্রহ জটিলতায় দূরের অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

দেশে ভোগ্যপণ্যের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। এ বাজারে আমদানি কিংবা দেশে উৎপাদিত নিত্যপণ্যের লেনদেন হয়। এমনকি বিভিন্ন প্রান্তের কারখানায় পরিশোধিত, মোড়কজাত পণ্যও বিক্রি হয় এখানে। প্রতিদিন এ বাজার থেকে সারা দেশে অন্তত ৩০০ ট্রাক ভোজ্যতেল সরবরাহ হতো। বর্তমান অবরোধের সময় ভোজ্যতেলের সরবরাহ অন্তত ৪০ শতাংশ কমে গেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবহনে আগের চেয়েও দ্বিগুণ সময়ক্ষেপণ হওয়ায় যানবাহনের ভাড়াও বেড়েছে ১০-১২ হাজার টাকা, যা পণ্যের দামের ওপর সমন্বয় হয়ে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। 

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার মেসার্স মিতালী স্টোরের স্বত্বাধিকারী অরুণ কুমার দে জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০ ট্রাক পাম অয়েল-সয়াবিন তেল চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করতেন। অবরোধ-হরতালের কারণে সেটি চার-পাঁচটিতে নেমে এসেছে। পরিবহন ভাড়া ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার ভোজ্যতেলে এক-দেড় টাকা পর্যন্ত বাড়তি বিক্রি করতে হচ্ছে। 

চট্টগ্রামভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থাপনা সংস্থা অল বেঙ্গল ট্রান্সপোর্টের স্বত্বাধিকারী সাধন মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সপ্তাহের হরতাল-অবরোধহীন দিনগুলোয়ই পণ্য পরিবহন করছেন অধিকাংশ যানবাহন মালিকরা। বিশেষত শুক্রবার ও শনিবার সবচেয়ে বেশি যানবাহন নামানো হয়। অবরোধের সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বাড়তি ভাড়ায় ঝুঁকি নিয়েও পণ্য পরিবহন করছে। এতে খাতুনগঞ্জ থেকে পণ্য পরিবহন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ভাড়া আগের তুলনায় ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের কেনাকাটায় প্রভাব পড়েছে।’

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, যানজট ছিল খাতুনগঞ্জের প্রতিদিনকার চিত্র। এখানে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান লোড-আনলোডের জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গত এক মাসে এ বাজারের সেই চিত্র পুরো পাল্টে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিত্যপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রায় সব অঞ্চলেই এসব পণ্যের বিভিন্ন মেয়াদে মজুদ থাকে। সংকটকালে প্রথমে মজুদ পণ্যের ওপর নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লেনদেন হয়। এরপর সরবরাহ চেইনে দীর্ঘমেয়াদে বাধা আসছে, তখন হঠাৎ করেই দামের উল্লম্ফন ঘটে। অবরোধের তিন সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং ও ডিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে আগের তুলনায় ৪০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ কমে গেছে। আমদানিকারকদের কাছ থেকে পণ্য বা ডিও সংগ্রহ কিংবা স্লিপ কাটা হলেও সরবরাহ না হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ঋণের কবলে পড়ছেন ব্রোকার বা ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে বাধ্য হয়ে লোকসানেও পণ্য বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। আগে নিয়মিত পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থ লেনদেন হতো বর্তমানে সেটি কমে যাওয়ায় মিলগেটেও পণ্য সংকট নেই। অবরোধের কারণে ধীরে ধীরে মজুদ কমে আসায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারে সরবরাহ সংকটে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

প্রধান নিত্যপণ্যের মধ্যে ভোজ্যতেল অন্যতম। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি পরিশোধন কারখানা থাকলেও চট্টগ্রামের মিলাররাই সারা দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। পাম অয়েলের শতভাগই যায় চট্টগ্রাম থেকে। সয়াবিন ও সুপার পাম অয়েলের ৫০-৬০ শতাংশ সরবরাহ হয় চট্টগ্রামের মিলগুলো থেকে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সহজে খালাস করে পরিশোধন সুবিধার কারণে এখানকার ভোজ্যতেলের দাম দেশের অন্যান্য মিলের চেয়েও কম। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে অবরোধকালে ভোজ্যতেলে উত্তরবঙ্গ, খুলনা কিংবা সিলেট অঞ্চলে পাঠানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়েছে। তাছাড়া চিনি, গম, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের জন্যও চট্টগ্রামের বাজার বেশি জনপ্রিয়। তবে অবরোধের কারণে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এসব পণ্যের দাম কেজিপ্রতি দেড়-দুই টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে বিক্রি করতে হবে বলে মনে করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

পণ্য পরিবহনে যুক্ত ট্রান্সপোর্ট, খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, স্বাভাবিক সময়ে সবচেয়ে দীর্ঘ দূরত্বের পণ্য পরিবহন ভাড়া ছিল ২২ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা। অবরোধ শুরুর পর তা বেড়ে ৩০-৩৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। অবরোধে পণ্য পৌঁছতে বাড়তি ঝুঁকি বিবেচনায় সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া হাঁকছেন পরিবহন মালিকরা। যে কারণে পণ্যের দামে বাড়তি ভাড়ার প্রভাব না ফেলতে অনেকেই কম সংগ্রহ, কম বিক্রি নীতিতে আছেন। যা পাইকারি বাজার, আমদানি ও প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর নিজস্ব নিত্যপণ্য মজুদ ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে মজুদ সংকটে নতুন করে দামের অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে খাতুনগঞ্জ থেকে আমদানীকৃত পণ্য গেলেও দেশের উত্তরবঙ্গ থেকে বিভিন্ন পণ্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরবরাহ হয়। অবরোধের প্রভাব সেখানেও পড়েছে। যে কারণে চাল, আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন দেশীয় পণ্যের কিছুটা সংকট এরই মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় বাজারগুলোয়।

জানতে চাইলে চাক্তাই চাল মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবরোধে দিনাজপুর, নওগাঁসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো থেকে চাল সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ সময় পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দীর্ঘ দূরত্বের পথে যানবাহন মালিকরা ঝুঁকি নিতে চান না। আগে রাজশাহী বিভাগ থেকে চালবাহী ট্রাক ভাড়া ২০-২২ হাজার টাকা ছিল। বর্তমানে সেটি বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এর প্রভাবে চট্টগ্রামের বাজারে চালের দাম বস্তাপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।’

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোজ্যতেল, চিনি কিংবা গমের জন্য চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার অন্যতম। এখানকার ভোজ্যতেল কিংবা গম যেতে না পারলে কিংবা সরবরাহ বিলম্ব হলে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রভাব পড়বে। আবার রাজশাহী অঞ্চল থেকে সবজি, চালসহ দেশীয় কৃষিপণ্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সেখানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর না হলে নিত্যপণ্য বাজার নিয়ে সংকট, মূল্যবৃদ্ধি আগামীতে আরো বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।  

ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক, পরিশোধন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক প্রদীপ কারণ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শীত মৌসুম হোক আর রাজনৈতিক সংকট হোক মিলগেটে পণ্যের চাহিদায় ভাটা পড়েছে। আগে যেখানে মিলগেটের সামনে পণ্য উত্তোলনে ট্রাকের সারি অপেক্ষায় থাকত, এখন নেই। আগে প্রতিদিন চট্টগ্রামের মিল থেকে শতাধিক ট্রাকে পাম অয়েল-সয়াবিন সরবরাহ দেয়া হলেও বর্তমানে সরবরাহ কমে অর্ধেকে নেমেছে।’

জানতে চাইলে খাদ্যশস্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কভিডকালীন সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ভোগ্যপণ্য খাত নিয়ে আমরা বেশ ভুগেছি। এক বছর ধরে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণেও এ খাতে অস্থিরতা রয়েছে। বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের বাজার অনেকটা স্থিতিশীলতায় ফিরলেও আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিত্যপণ্য নিয়ে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। সরবরাহ অঞ্চল থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য যথাসময়ে পৌঁছতে না পারলে কৃত্রিম সংকট দেখা দেয়। বর্তমানে চালসহ দেশে উৎপাদিত পণ্য নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া সংগ্রহ করছেন না ব্যবসায়ীরা।’

হরতাল-অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার মুহূর্তে ফের অঞ্চলভেদে খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থির হওয়ার শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তিনি।