কারওয়ান বাজার এলাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী মো. পলাশ। চলমান কভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিদিনই বুথের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যাপক ঝুঁকি নিয়ে কর্মস্থলে আসতে হচ্ছে এ যুবককে। গ্রাহকের খুব কাছে গিয়ে সেবা দিতে হলেও সুরক্ষা সামগ্রী হিসেবে পেয়েছেন সাধারণ একটি মাস্ক ও এক জোড়া গ্লাভস। সারা দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনায় নিজের নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কিত এ নিরাপত্তাকর্মী।
তিনি জানালেন, কাঁচাবাজার ও আড়ত থাকায় এ এলাকায় লোক সমাগম অনেক বেশি। বাজারের ব্যবসায়ীরাও এখন ব্যাংকে না গিয়ে বুথে বেশি আসেন। কেনাকাটা করতেও অনেকে বুথে টাকা তুলতে আসেন। এখানে নানারকম মানুষ আসছেন। নভেল করোনাভাইরাস যেহেতু ছোঁয়াচে, গ্রাহকের শরীর থেকে আমার শরীরেও চলে আসতে পারে। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই দায়িত্ব পালন করছি।
মো. পলাশের মতোই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন একই এলাকার আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী নূর নবী। মধ্যবয়সী এ লোকটিও করোনার ঝুঁকি নিয়েই দিনের অর্ধেক সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেন। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন এ নিরাপত্তাকর্মী। তার ভাষ্যে, এখানে প্রতিদিন অনেক মানুষই টাকা তুলতে আসেন। কারো শরীর থেকে যদি আমার শরীরে ভাইরাস আসে, তাহলে তো বাসার লোকজনেরও এ রোগ হবে। খাওয়া-পরার জন্যই এ চাকরি। নইলে বাসা থেকেই বের হতাম না।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ব্যাংক, ব্যাংকের এটিএম বুথ, নির্মাণাধীন অবকাঠামো, হাসপাতাল, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরা কভিড-১৯ ঝুঁকির মধ্যেই কাজ করছেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় অন্যের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এ কর্মীরা এখন শঙ্কায় রয়েছেন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটি সার্ভিসেস কোম্পানিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন মহাসচিব শাহ আলম সরকার বলেন, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় দুই লাখ নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে লক্ষাধিক নিরাপত্তাকর্মীকে এখনো কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। ধরতে গেলে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতো নিরাপত্তাকর্মীরাও ফ্রন্টলাইনারের মতো কাজ করছেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তাদের তেমন কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থাই নেই। এজন্য তাদের ঝুঁকিও অনেক বেশি। মালিকপক্ষের কাছ থেকে কিছু সুরক্ষাসামগ্রী দেয়া হলেও সেগুলো নিম্নমানের ও অপর্যাপ্ত। অনেক প্রতিষ্ঠান করোনার শুরুর দিকে একটি মাস্ক ও কিছু গ্লাভস দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। সবার সামর্থ্যও নেই। তাই সরকার যে রেশন কার্ডের কথা বলছে, সেখানে এ নিরাপত্তাকর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
নিরাপত্তাকর্মীদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত ৫৯টি ব্যাংকের মধ্যে এটিএম বুথভিত্তিক সেবা দিচ্ছে ৫১টি ব্যাংক। তথ্যমতে, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশের সব ব্যাংকের এটিএম বুথের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৭২২। এটিএম বুথগুলোর সিংহভাগই রাজধানীসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং জেলা শহরেও স্থাপিত। একেকটি এটিএম বুথে দুজন ধরে হিসাব করলেও শুধু এসব বুথেই নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি।
এদিকে ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংকাররা ভাতা পেলেও ব্যাংকিং সেবার কাজ করেও কোনো ধরনের ভাতা পাচ্ছেন না এসব নিরাপত্তাকর্মী। জানা গেছে, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাংকারদের মধ্যে সেবা দেয়া নিয়ে আপত্তি উঠলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণোদনা ও ঝুঁকি ভাতা দেয়ার নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশ অনুযায়ী সাধারণ ছুটি ঘোষণা হওয়ার পর যেসব ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী সশরীরে ১০ দিন অফিস করছেন, তারা পুরো মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ভাতা হিসেবে পাবেন। এর কম হলে আনুপাতিক হারে পাবেন। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের কারণে করোনায় আক্রান্ত হলে ব্যাংকাররা পাবেন ৫-১০ লাখ টাকা করে। মারা গেলে পাঁচ গুণ। এছাড়া চিকিৎসা খরচ পুরোপুরি ব্যাংক বহন করবে।
কিন্তু সর্বক্ষণ ব্যাংক, ব্যাংকার ও গ্রাহকের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য এ ধরনের কোনো সুযোগ-সুবিধাই নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটি সার্ভিসেস কোম্পানিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শাহ আলম সরকার বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের বড় অংশই ব্যাংকের এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করছেন। এটিএম বুথে গ্রাহকের বুথে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় দরজা খুলে দেয়ার কাজটি করতে হয় নিরাপত্তাকর্মীকেই। এজন্য এ নিরাপত্তাকর্মীদের ঝুঁকিও অনেক বেশি। অন্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে হলেও ব্যাংকগুলোও এ নিরাপত্তাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে পারে। ব্যাংকের গ্রাহকদের সেবার জন্যই তো ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তারা।
ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে আবাসিক এলাকা ও ভবনের নিরাপত্তাকর্মীদেরও। তাদের জন্য কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা একেবারেই নেয়া হয়নি বললেই চলে। এ প্রসঙ্গে হাতিরঝিলের মহানগর আবাসিক এলাকার একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বলেন, স্যারদের বাজারের কাজ থেকে শুরু করে বাড়ির নিরাপত্তা সবকিছুই আমাকে করতে হয়। পার্সেল রিসিভ করতে হয়। অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। যদিও আমার জন্য বাড়ির মালিক কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি।









