খরাপ্রবণ রাজশাহী অঞ্চলে বাড়ছে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ। এক যুগে আমবাগানের পরিধি ও উৎপাদিত ফলের পরিমাণ দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। এসব বাগানে নিরাপদ আম উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু ফলন ও বাগানের ব্যাপ্তির সঙ্গে সেই অর্থে বাড়েনি বাজার। যার কারণে ভরা মৌসুমেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না চাষী-বাগান মালিকরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আম রফতানি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে রফতানি বাড়ানোর জন্য ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, রাজশাহী বিমানবন্দর থেকে কার্গো সুবিধা চালুসহ বেশকিছু পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে। এরই মধ্যে ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও প্রণয়ন করেছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এ পরিকল্পনা অনুমোদনের পর তা বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে ৫০ কোটি টাকার বেশি আম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা যাবে।

রাজশাহীর পবায় ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে বিএমডিএ। প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্য মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। যদিও পরিকল্পনা কমিশনে এখনো এর অনুমোদন মেলেনি। তবে বিএমডিএর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কেবল আম প্রক্রিয়াজাত করেই প্লান্ট থেকে মৌসুমে আয় হবে কোটি টাকার বেশি। আম ছাড়াও রফতানির উদ্দেশ্যে শাক-সবজিও প্রক্রিয়াজাত করা যাবে এখানে। এ বিপুল কর্মযজ্ঞ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনীতির গতি পাল্টে দেবে। সৃষ্টি হবে বিপুল কর্মসংস্থান।

সূত্রটি আরো জানিয়েছে, রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের পাশে বিমানবন্দর সংলগ্ন তকিপুর মৌজায় এ প্লান্ট স্থাপনের কথা রয়েছে। এজন্য ৬০ শতক জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়বে। এ প্লান্ট স্থাপন করা গেলে ঘণ্টায় তিন হাজার কেজি হিসেবে দৈনিক প্রায় ৫০ টন আম প্রক্রিয়াজাত সম্ভব হবে। সে হিসেবে এক মৌসুমে প্রায় পাঁচ হাজার টন আম প্রক্রিয়াজাত করা যাবে এ প্লান্টে। যার রফতানি মূল্য হবে ৫০ কোটি টাকার বেশি। রাজশাহী বিমানবন্দরে কার্গো সুবিধা চালু হলে এখান থেকে সহজেই রফতানি করা যাবে আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য।

প্রকল্পটি নিয়ে কাজ করছেন বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এটি একটি সমন্বিত প্লান্ট। একই সঙ্গে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আম সংগ্রহের পর প্রথম ধাপে পরিপক্বতা যাচাই করা হবে। এর পর বিচ্ছিন্ন করা হবে বোঁটা। পরের ধাপে আকার অনুযায়ী বাছাই করে ধোয়া হবে আম। এ পর্যায়ে প্রথম ধাপে গরম পানির ধারায় আম পরিষ্কার করা হবে। এরপর দেয়া হবে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট। এ ধাপেই আম জীবাণুমুক্ত হবে। লেবেলিং বা মোড়ানোর পর চলে যাবে প্যাকেটজাতে। প্রি-কুলিংয়ের পর আম যাবে অস্থায়ী গুদামে। সেখান থেকেই রফতানির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবে আম।

এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের সদ্য সাবেক প্রধান ড. আলীম উদ্দিন। তিনি জানান, তাদের কাছে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট আছে। আপাতত হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করে আম বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়। তবে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা আমের প্রচুর চাহিদা রয়েছে জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। রাজশাহীতে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট হলে এসব দেশে আম রফতানির সুযোগ মিলবে। কৃষকরা আমের ভালো দাম পাবেন।

বিএমডিএর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বাঘার চুক্তিভিত্তিক আমচাষী শফিকুল হক ছানা। তিনি বলেন, রফতানির উদ্দেশ্যে বাগান থেকে আম এখন প্রথমে ঢাকায় কোয়ারেন্টিনে নিতে হয়। সেখান থেকে প্যাকিং হাউজে যায় আরেক জায়গায়। এরপর যায় বিমানবন্দরে। এটি একটি লম্বা প্রক্রিয়া। এতে খরচ ও ভোগান্তি বাড়ে। আমও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারি না। 

রাজশাহী এগ্রো ফুড প্রডিউসার সোসাইটির সভাপতি আনোয়ারুল হকও একই কথাই বলেছেন। সমাধান হিসেবে আম উৎপাদন এলাকায় সমন্বিত প্যাকিং হাউজ চান তিনি। পাশাপাশি রফতানি প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে রাজশাহীতে কোয়ারেন্টিন সুবিধা এবং রাজশাহী বিমানবন্দরে কার্গো সুবিধাও চান। 

তিনি বলেন, এখন বাগান থেকে ঢাকায় কোয়ারেন্টিন স্টেশন ও প্যাকিং হাউজে আম নেয়ার সময় পথে অনেক আম নষ্ট হয়। পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। এতে বেশ আর্থিক ক্ষতির শিকার হন ব্যবসায়ীরা। তাই রাজশাহী থেকেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষে একেবারে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে সব পক্ষই লাভবান হবে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর আমচাষীরা এখান থেকেই সব ধরনের সুবিধা নিতে পারবেন।

গত বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম গবেষণা কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে এ অঞ্চলে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। সবশেষ গত ২৮ জুলাই রাজশাহীতে স্থানীয় আম রফতানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সেখানে রাজশাহীতে সমন্বিত ওয়্যারহাউজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান।

রাজশাহী বিএমডিএর আওতাধীন এলাকা হওয়ায় কৃষিমন্ত্রী বিএমডিএকে এ অঞ্চলে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশিদ। তিনি বলেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প দাখিল করা হয়। তবে প্রকল্পটি এখনো পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে আম রফতানি এখনো স্থিতিশীল পর্যায়ে আসেনি। আমের মান নিয়ন্ত্রণ করে সরবরাহ ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে সরকারের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এজন্য কৃষিভিত্তিক ইপিজেড স্থাপন, বিমানবন্দর থেকে কার্গো বিমান চালুসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ মৌসুমে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট আমবাগান ছিল ৪২ হাজার ৪১৭ হেক্টর। চলতি মৌসুমে এ চার জেলায় আমবাগান দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৮৯৪ হেক্টরে। সেই হিসেবে গত এক যুগে এ অঞ্চলে আমবাগান বেড়েছে ৪৮ হাজার ৪৭৭ হেক্টর। 

অন্যদিকে, ২০১১-১২ মৌসুমে এ চার জেলায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৭৩ টন আম উৎপাদন হয়েছে। চলতি মৌসুমে আম উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৯১৩ টন। এ চার জেলায় গত এক যুগে আম উৎপাদন বেড়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪০ টন। 

আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের হিসাবে ২০১১-১২ মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৩ হাজার ২৮০, রাজশাহীতে ৮ হাজার ৯৮৬, নওগাঁয় ৭ হাজার ৮০১ এবং নাটোরে ২ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল। চলতি মৌসুমে আমবাগান দাঁড়িয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ১৬৫, নওগাঁয় ২৯ হাজার ৪৭৫, রাজশাহীতে ১৮ হাজার ৫১৬ এবং নাটোরে ৫ হাজার ৭৩৯ হেক্টরে।