শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ডিভাইস সহজলভ্য করতে হলে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং কর্পোরেট খাতের সমন্বয়ে একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প সুদে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে সুদমুক্ত ডিভাইস ঋণ চালু করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে হাজার কোটি টাকার নতুন অবদান যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬-এর অংশ হিসেবে ‘অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স টুওয়ার্ডস অপরচুনিটিজ: ফাইন্যান্সিং ডিজিটাল ডিভাইস ফর স্টুডেন্টস টু বিল্ড অ্যান ইন্টেলিজেন্ট সোসাইটি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব মত উঠে আসে।

সেমিনারে ‘স্বপ্ন থেমে থাকা বদলাতে হবে’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ডিভাইস ব্যবহারের হার অন্তত ৮০ শতাংশে নিতে হবে।

কৃষিঋণের মতোই দক্ষতা উন্নয়নমুখী শিক্ষার্থী ডিভাইস ঋণের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সেমিনারে সভাপতি বিল্ডকন কনসালটেন্সি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দীন আহমদ বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য ডিভাইস ঋণদানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। অন্যান্য খাতে অনাদায়ী ঋণ মেনে নেয়া হলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এলেই বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ জায়গায় একটি সুস্পষ্ট পলিসি না থাকায় উদ্যোগগুলো টেকসই হচ্ছে না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট হলেও মাত্র ১০ শতাংশ শিল্পখাতে যুক্ত হতে পারে বলে জানান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সংযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছে বলে অভিমত তার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আলিফ রুদাবা বলেন, সরকার কোর্স ফাইন্যান্সিং নিয়ে কাজ করলেও ডিভাইস ফাইন্যান্সিং এখনো কাঠামোগতভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রকল্পগুলোর স্বল্পমেয়াদি চরিত্র ও ঋণ আদায়ের ঝুঁকি এর অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় ডিভাইস ফাইন্যান্সিংয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সুপর্ণা রয়। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আইডেন্টিটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংক ও এমএফএস প্ল্যাটফর্মের ডেটা সংযোগ, সাবসিডি মডেল চালুর ওপর জোর দেন তিনি।

আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দীন বলেন, ইন্টারনেট অবকাঠামো এখন প্রায় সারাদেশে বিস্তৃত হলেও ডিভাইসের অ্যাক্সেস সীমিত। তরুণদের মূলধারায় আনতে হলে মাধ্যমিক স্তর থেকেই ডিভাইস ফাইন্যান্সিং ও নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

অ্যাক্সেটেক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আদিল হোসেন নোবেল বলেন, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সরাসরি ফাইন্যান্স করতে আগ্রহী নাও হতে পারে। তাই প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন একটি ফাইন্যান্সিং মডেল তৈরি করতে হবে।

ফিজিশিয়ান ও বিশ্লেষক আব্দুন নূর তুষারের মতে, ডিভাইস ঋণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও ডিভাইস ব্যবহারের মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। ডিভাইসসংক্রান্ত একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগোনোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।