ভারত-পাকিস্তানর পাল্টাপাল্টি হামলার পর থেকেই বাংলাদেশের সীমানায় ‘পুশ-ইন’ শুরু করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের সীমানায় পুশ-ইন করা অর্থাৎ জোর করে ঠেলে দেয়া এসব মানুষের মধ্যে বাংলাদেশীর পাশাপাশি রোহিঙ্গা ও ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন। গতকাল ভোরে ও আগের দিন রাতে পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার, লালমনিরহাট, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা ও ফেনীর সীমান্ত এলাকা দিয়ে আরো ১০৫ জনকে পুশ-ইন করেছে বিএসএফ।

এর আগে ১০ মে রাতে সাতক্ষীরায় সুন্দরবনের চরে ৭৮ জনকে ফেলে রেখে যায় বিএসএফ ও কোস্টগার্ড। পরদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে কোস্টগার্ডের একটি বাসে তাদের শ্যামনগর থানায় পৌঁছানো হয়। এছাড়া সম্প্রতি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ি সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করানো হয় ৬৬ জনকে। তারা নিজেদের গুজরাটের বাসিন্দা বলে দাবি করেছেন। কুড়িগ্রাম দিয়ে পুশ-ইন করা ৪৪ জনের মধ্যে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীও রয়েছেন বলে জানা গেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে পুশ-ব্যাক বা পুশ-ইন আসলে এমন একটা পদ্ধতি, যেখানে ধরা পড়া ব্যক্তিদের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে অন্য দেশের সীমান্তে ঠেলে দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ার কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এ পদ্ধতি চলে আসছে, যেটা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই স্বীকার করে না। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা পাচারের শিকার হওয়া নারীদের অনেক ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দিয়ে থাকে বিএসএফ। আইন অনুযায়ী পুলিশ কাউকে ধরলে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নিয়ম রয়েছে। এ নিয়ম বিদেশীদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। এরপর দেশটির প্রচলিত আইনে তাদের বিচার হবে। বিচার প্রক্রিয়া ও সাজাভোগ শেষে তাদের নিজ দেশে হস্তান্তরের বিধান রয়েছে।

বিজিবির তথ্য বলছে, গতকাল ভোর ৪টার দিকে পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের জয়ধর ভাঙ্গা বিওপি এলাকায় ২১ বাংলাদেশীকে ঠেলে দেয় বিএসএফ। পরে তাদের আটক করে বিজিবি। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ, ১৩টি শিশু ও ছয়জন নারী রয়েছে। তারা ভারতের গুজরাট প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন। তারা খুলনা ও নড়াইল জেলার অধিবাসী ছিলেন। গতকাল বিকালে তাদের পঞ্চগড় সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।

বিজিবি-৫৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শেখ বদরুদ্দৌজা জানান, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে পতাকা বৈঠক করা হয়েছে। তবে পতাকা বৈঠকে বিএসএফ পুশ-ইনের বিষয়টি স্বীকার করেনি।

এদিকে মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ আরো সাতজনকে পুশ-ইন করেছে বিএসএফ। বিজিবির তথ্য বলছে, এ নিয়ে জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ১৫৫ জনকে পুশ-ইন করা হয়েছে। এর মধ্যে বড়লেখা উপজেলা দিয়ে ১১৯ জন, কুলাউড়া দিয়ে ২১ ও কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত দিয়ে ১৫ জনকে পুশ-ইন করা হয়।

বিজিবি জানায়, গতকাল সকালে কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে সাতজনকে পুশ-ইন করে বিএসএফ। পরে বিজিবির সদস্যরা তাদের আটক করেন। আটককৃতদের মধ্যে দুজন পুরুষ, দুজন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে। তারা সবাই কুড়িগ্রাম জেলার বাসিন্দা।

৪৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএসএম জাকারিয়া জানান, আটক ব্যক্তিরা সবাই বাংলাদেশী। তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের কুলাউড়া থানায় হস্তান্তর করা হবে।

অন্যদিকে বুধবার রাতে লালমিনরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার গাটিয়ারভিটা সীমান্ত দিয়ে দুই দফায় নারী ও শিশুসহ ২০ জনকে পুশ-ইন করেছে বিএসএফ। পরে তাদের আটক করে ধবলসূতী ও ঝালাঙ্গী বিজিবি ক্যাম্পে হস্তান্তর করেন স্থানীয়রা। আটককৃতদের দাবি, তারা সবাই বাংলাদেশী। তাদের বাড়ি নড়াইল, যশোর ও খুলনা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে। রংপুর তিস্তা-২ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও পাটগ্রাম থানা পুলিশ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

পাটগ্রাম থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, তাদের গাটিয়ারভিটা ও ঝালাঙ্গী সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন করা হয়েছে। এদের মধ্যে নড়াইল জেলার ১৭ জন, যশোরের দুজন ও খুলনার একজন রয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল তাদের ভারতের গুজরাট প্রদেশের সুরাট শহর থেকে আটক করে বিএসএফ ও পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়। ২১ মে বিমানে পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা বিমান ঘাঁটিতে তাদের আনা হয়। পরে সেখান থেকে বাসে বিভিন্ন সীমান্তে এনে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হয়েছে।

এছাড়া খাগড়াছড়ির রামগড় সীমান্ত দিয়ে গতকাল শিশুসহ পাঁচজনকে পুশ-ইন করা হয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম সীমান্ত থেকে রামগড় সীমান্তের ফেনী নদী দিয়ে তাদের পুশ-ইন করে বিএসএফ। সাময়িকভাবে তাদের রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি, উপজেলা প্রশাসন ও রামগড় থানা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ইসমত জাহান তুহিন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানান, তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য এবং ভারতের হরিয়ানার বাসিন্দা। সেখানে একটি ইটভাটায় কাজ করতেন তারা।

একইভাবে গতকাল ভোরে কুমিল্লার গোলাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ ১৩ জনকে পুশ-ইন করেছে বিএসএফ। কুমিল্লা ১০ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মীর আলী এজাজ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, বিএসএফ নারী-শিশুসহ ১৩ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করে। এ সময় বিজিবি টহল দল তাদের আটক করে। তাদের মধ্যে পুরুষ তিনজন, নারী তিনজন এবং সাত শিশু রয়েছে। তারা সবাই বাংলাদেশী। তাদের বিজিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এছাড়া ফেনীর ছাগলনাইয়া ও ফুলগাজী সীমান্ত দিয়ে আরো ২৪ জনকে পুশ-ইন করা হয়েছে। গতকাল ভোরে তাদের সীমান্তের এপারে ছেড়ে দেয়া হয়।

বিজিবি জানায়, যশপুর ও খেজুরিয়া বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত দিয়ে ২৪ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় বিএসএফ। পরে বিজিবি ও পুলিশ তাদের আটক করে। ২৪ জনের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, পাঁচজন নারী ও ১৩ শিশু রয়েছে। তাদের ছাগলনাইয়া ও ফুলগাজী থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

ফেনী-৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন জানান, গতকাল ভোরে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় তাদের আটক করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তাদের থানায় দেয়া হয়েছে।