হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে যে কয়টি রাতের স্মৃতি এখনো আমাদের তাড়া করে বেড়ায়, তার মধ্যে একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত অন্যতম। কেমন ছিল সে রাতের ভয়াবহতা, যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাদের নানা সময়ে গণমাধ্যমের বয়ান থেকে অনেকটা আঁচ করা যায়।

২৫ মার্চ রাতের স্মৃতি থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মো. আবু শামার ভাষায়, ‘ফজরের আজানের পর আর্মিরা রাজারবাগের এক ও দুই নম্বর গেট দুটি ট্যাংকের সাহায্যে ভেঙে ভেতরে ঢোকে। আসে ১০টি খালি ট্রাকও। এক থেকে দেড়শ পুলিশের লাশ পড়ে ছিল। ওগুলো ট্রাকে করে ওরা সরিয়ে ফেলে (ডয়চে ভেলে, ২৫ মার্চ ২০২৩)’। হানাদার বাহিনী সে রাতে একে একে পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাঁখারি বাজারসহ সমগ্র ঢাকাতেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে শুরু করে ভয়াবহ আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ। শুরু করে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বাঙালি নিধনের এক মহাপ্রচেষ্টা। অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকায় উঠে এসেছে, শুধু ২৫ মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়েছিল, যা জেনোসাইডের ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা।

২৫ মার্চের রাত সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন লিখেছেন, ‘সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমগ্র বাংলাদেশ হয়ে উঠল শকুনতাড়িত শ্মশান ভূমি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), রোকেয়া হল, জগন্নাথ হলে চলে মধ্যযুগীয় কায়দায় পাকহানাদার বাহিনীর বর্বরতা। হত্যা করা হয় কয়েকশ ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন বিভাগের নয়জন শিক্ষক।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত এবং ঠাণ্ডা মাথার খুন। ইতিহাসের দলিল থেকে তার প্রমাণ মেলে। একাত্তরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বাঙালি নিধনে গৃহীত কৌশল ইতিহাসে ‘পোড়ামাটি নীতি’ নামে বহুল সমালোচিত অমানবিক সমর নীতি। যার মূল ভাষ্য ছিল ‘ওই দেশের মানুষ চাই না, মাটি চাই’। একাত্তরের দীর্ঘ নয় মাস ধরে পাক হানাদার বাহিনী এবং তারা এ দেশের সহযোগীদের সহায়তায় এ নীতি বাস্তবায়ন করতে থাকে। তার প্রথম দৃশ্যত পদক্ষেপ একাত্তরের ২৫ মার্চের অপারেশন।

একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাক হানাদার বাহিনী এমন কোনো ঘৃণিত বর্বরোচিত, নৃশংস কর্মকাণ্ড নেই যা তারা করেনি। আজ প্রায় ৫৩ বছর হতে চলল, কিন্তু এখনো মেলেনি একাত্তরের জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ‘জেনোসাইড ওয়াচ’ এবং ‘লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন’ নামক দুটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মিলেছে একাত্তরের জেনোসাইডের স্বীকৃতি।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। ফলে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের কারণে ২৫ মার্চের জেনোসাইডের বিষয়টি সবসময় আলোচনায় থাকে এবং স্মরণ করা হয়ে থাকে। এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য কয়েকটি বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।

প্রথমত, জেনোসাইডের বাংলা শব্দ হিসেবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে সর্বত্র প্রচারিত হয়ে আসছে, কিন্তু জেনোসাইডের ব্যাপকতা জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘জেনোসাইড কনভেনশন’-এর ০২ নং অনুচ্ছেদে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যদি একাত্তরের জেনোসাইডের স্বীকৃতির দিকে গুরুত্বারোপ করতে থাকি, তাহলে ‘জেনোসাইড’ শব্দটিকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে ব্যাখ্যা ও সুপ্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, একাত্তরের জেনোসাইডের ওপর বিশেষায়িত গবেষণা দরকার।

অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ঘটনার আলোকপাত, নানা প্রমাণাদি সংরক্ষণের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ উদ্যোগ এবং আরো নতুন নতুন নানা দিক ফোকাস করে বিশেষায়িত গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেয়া দরকার এবং তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং জার্নালে গবেষণার বিবরণী প্রকাশের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন অতিক্রম হওয়া বা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের কারণে অনেক প্রমাণ বা দলিলাদির প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে যেসব প্রমাণাদি আছে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার সর্বাত্মক প্রয়াস নিতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আরো বেশি প্রমাণ সংগ্রহের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। চতুর্থত, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে যোগাযোগ বাড়াতে হবে, প্রয়োজনে জাতিসংঘের স্বীকৃতির মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি আইনি কাঠামো দাঁড় করানোর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। সর্বশেষ একাত্তরের জেনোসাইডের জাতিসংঘের স্বীকৃতির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। একাত্তরের ইতিহাসের একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে কূটনৈতিক দিক।

একাত্তরের জেনোসাইডের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। একটি বিষয় বলে রাখা দরকার, হয়তো ৫০ বছরের অধিক সময় এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু ইতিহাস থেকে জানা যায়, আর্মেনীয় জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে প্রায় ১০০ বছর সময় লেগেছে। সুতরাং একাত্তরের জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য পরিকল্পনামাফিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোর প্রচেষ্টা চালানোর কোনো বিকল্প নেই।

 

জিএম আরিফুজ্জামান: সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়