বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও বিপুল আর্থিক দায়ে বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পুনর্গঠনে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দ্বিতীয় তেল শোধনাগার নির্মাণ এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা জোরদারে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

আজ রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় বিদ্যুৎ খাতে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। আগের সরকার বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে গেছে। একই সঙ্গে সার্বভৌম গ্যারান্টির আওতায় করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো এমনভাবে সম্পাদিত হয়েছিল, যা পুনর্বিবেচনা করাও অত্যন্ত কঠিন। এরপরও সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে সমাধানে কাজ করছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের উদ্যোগ নিয়েছে। সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি এ খাত থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ২০৩১ সাল পর্যন্ত ট্যাক্স হলিডে ঘোষণা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব প্রণোদনার ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হবেন। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা মূলত বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ (উইন্ড পাওয়ার) এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (ওয়েস্ট-টু-এনার্জি) উৎপাদনেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যাতে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।

তিনি আরো বলেন, বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বাসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রিক যানবাহনের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। এতে জ্বালানি তেলের আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

মন্ত্রী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটলেও সৌরবিদ্যুৎ সবসময় সমানভাবে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বর্ষাকালে সূর্যালোক কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়। তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে গ্যাস ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সচল রাখতে হবে।

তিনি জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরে নতুন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান না হওয়ায় বর্তমান সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় একদিকে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, অন্যদিকে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তরের জন্য একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (স্রেডা) শক্তিশালী করতে পৃথক বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দীর্ঘদিনের পুরোনো একমাত্র তেল শোধনাগারের পরিবর্তে দ্বিতীয় রিফাইনারি নির্মাণে কারিগরি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি আরো বলেন, গ্যাস আমদানি বাড়াতে নতুন ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ভুটান, নেপাল ও ভারতের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো গেলে স্বল্প খরচে শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া, শিল্প খাতে ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং একটি আধুনিক, টেকসই ও দক্ষ জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা। এজন্য বাজেটের প্রতিটি টাকা যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি কর ও শুল্ক নীতিতে দেয়া ব্যাপক প্রণোদনাগুলো বিবেচনায় নিলে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এ খাতের অন্যতম বড় সহায়তা। তিনি এজন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।