ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ উন্নয়ন (কেইস) প্রকল্পের ‘বিরাট সাফল্য’ দাবি করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। শুধু কেইস নয়, জলবায়ু তহবিলের অর্থে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাতশর বেশি প্রকল্প নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে চার শতাধিক প্রকল্প। যদিও প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় কমিটি।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় কেইস প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। মূল্যায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে অর্জিত সাফল্যকে বেশ ইতিবাচক দাবি করা হলেও তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে সংসদীয় কমিটি। সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণ বলছে, জলবায়ু ফান্ডের আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয়িত অর্থের স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে সব প্রকল্পে ঠিকমতো নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না।
জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, জলবায়ু ফান্ডের আওতায় বিভিন্ন প্রকল্প উন্নয়ন, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যেসব দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে সংসদীয় কমিটি একমত নয়। এরই মধ্যে কেইস প্রকল্পের নিরীক্ষা ও প্রভাব মূল্যায়ন করতে আমরা আইএমইডিকে সুপারিশ করেছি। সেই অনুযায়ী সংসদীয় কমিটি পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে।
জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক তহবিল ও দেশীয় তহবিল থেকে অভিঘাত ও প্রশমন খাতে অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আবার অনেক প্রকল্প রয়েছে বাস্তবায়নাধীন। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে ২০০৯-১০ থেকে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত অভিযোজন ও প্রশমন খাতে এ যাবৎ সরকারি খাতে ৬৫৯টি ও বেসরকারি খাতে ৫৭টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এগুলোর মধ্যে ৪১১টি প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বাস্তবায়িত বা বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে এলডিসি ফান্ডের আওতায় ২৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি প্রকল্প। এছাড়া জিসিএফের আওতায় ৭২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি প্রকল্প এবং অ্যাডাপ্টেশন ফান্ডের আওতায় ৮৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প সদ্য অনুমোদন পেয়েছে। সিডিএমের আওতায় রয়েছে ১৩টি প্রকল্প। জেসিএমের আওতায় চারটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং দুটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
জলবায়ু তহবিলের অর্থ থেকে ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কেইস প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের এ প্রকল্পে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মিলে খরচ করেছে ৪৫৩ কোটি টাকা। বাকি ৫৩ কোটি টাকা খরচ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ২০০৯ সালে শুরু হয়ে চলতি বছরের জুনে শেষ হয়েছে এসব অবকাঠামোর নির্মাণকাজ। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার বায়ুর মান উন্নয়ন। ঢাকার বায়ুর মানে কোনো উন্নতি না হলেও সম্প্রতি এ প্রকল্পে ব্যাপক সাফল্য দাবি করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় সফল বললেও কেইস প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত এসব অবকাঠামোর সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, গত ১০ বছরে ঢাকার যানবাহনের গড় গতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। দিন দিন প্রকট হচ্ছে যানজট পরিস্থিতি। একই সঙ্গে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনাও বাড়ছে। গত কয়েক মাসের দিকে লক্ষ করলেই একাধিক আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া যাবে। যেগুলো আলোচিত হচ্ছে না, সেসব দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেক বেশি। দূষণও বেড়েছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি নিয়ে যে মূল্যায়ন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় করেছে, সেটি কোনোভাবেই মানতে রাজি নন তিনি।
জলবায়ু তহবিলের প্রকল্পগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল না হওয়ার পেছনে অর্থ ব্যয়ে অস্বচ্ছতার পাশাপাশি জনবল সংকটের কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, জলবায়ু তহবিলবিষয়ক কার্যক্রম পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরাসরি পরিচালনা করা হয়ে থাকে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরে জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন নামের একটি শাখা রয়েছে, যার সাংগঠনিক কাঠামোতে অনুমোদিত জনবল মাত্র সাতজন। তবে বর্তমানে কর্মরত রয়েছে তিনজন, যাদের একজন পরিচালক, একজন উপপরিচালক ও একজন সহকারী পরিচালক। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু ফান্ডের আওতায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সীমিত জনবল কার্যপরিধির তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন।









