বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর হবে আজ। এর মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মোট সাত রাউন্ডের নেগোসিয়েশনে আলোচনার পর দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্নের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয় গত ২২ ডিসেম্বর।
জাপানের রাজধানী টোকিওতে স্থানীয় সময় আজ দুপুরের পর বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (বিজেইপিএ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুদিন আগেই জাপানে পৌঁছেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চার কর্মকর্তা। তারা হলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অনুবিভাগের প্রধান আয়েশা আক্তার, যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, উপসচিব মাহবুবা খাতুন মিনু এবং সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ হাসিব সরকার। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গতকাল দুপুর পৌনে দুইটায় জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান। ৭ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য উপদেষ্টার ঢাকা ফেরার কথা রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে জাপানের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে। অন্যদিকে জাপান ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে বাংলাদেশের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বাংলাদেশ-জাপান ইপিএর মূল বৈশিষ্ট্য হলো বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য চুক্তিস্বাক্ষরের দিন থেকেই জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে। এছাড়া তৈরি পোশাক খাতে সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন সুবিধাও পাবে।
চুক্তির অধীনে সেবা বাণিজ্য খাতেও উভয় দেশ উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি উপখাতে চারটি মোডে সার্ভিস উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর আরো ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ নেগোসিয়েশনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গঠিত যৌথ গবেষণা দলের প্রতিবেদন একযোগে প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ১৭টি সেক্টর অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে নেগোসিয়েশন পরিচালনার সুপারিশ করা হয়। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ ইপিএ নেগোসিয়েশন শুরুর লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় উভয় দেশ।
সম্মত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯-২৩ মে ঢাকায় প্রথম রাউন্ডের নেগোসিয়েশন অনুষ্ঠিত হয়। তবে কিছু অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের কারণে নেগোসিয়েশন সাময়িকভাবে স্থগিত হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এ চুক্তির গুরুত্ব বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার নভেম্বর ২০২৪ থেকে পুনরায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যক্রম শুরু ও এক বছরের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন করার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে দ্বিতীয় রাউন্ডের নেগোসিয়েশন শুরু হয়। ঢাকায় সে আলোচনা হয় ২০২৪ সালের ১০-১৪ ডিসেম্বর। তৃতীয় রাউন্ড নেগোসিয়েশন হয় টোকিওতে। ২০২৪ সালের ১৯-২০ ডিসেম্বর উভয় পক্ষ আলোচনা আরো জোরদার করে। গত বছর ২-৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ রাউন্ডের নেগোসিয়েশন, যা উভয় পক্ষের আলোচনা ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালের ২০ থেকে ২৬ এপ্রিলে টোকিওতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম রাউন্ডের নেগোসিয়েশনে উভয় পক্ষ জরুরি ভিত্তিতে অগ্রগতি সাধনে উদ্যোগী হয়।
ইপিএর ষষ্ঠ রাউন্ড নেগোসিয়েশন অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায় গত বছরের ২১-২৬ জুন। যেখানে চুক্তির বিস্তারিত বিষয়গুলো স্পষ্ট রূপ নিতে শুরু করে। গত বছর ৩-১২ সেপ্টেম্বর সপ্তম ও চূড়ান্ত রাউন্ড নেগোসিয়েশন অনুষ্ঠিত হয় টোকিওতে। যার মাধ্যমে আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এ ধারাবাহিকতার মাধ্যমে সম্মত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী সাত রাউন্ড নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে উভয় দেশ ইপিএ টেক্সট চূড়ান্ত করে।
গত ২২ ডিসেম্বর বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিৎশু বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (বিজেইপিএ) নেগোসিয়েশন সম্পন্নের যৌথ ঘোষণা দেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ এ প্রথম বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে। এ চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
জাপান থেকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে আছে যন্ত্রপাতি ও মেকানিক্যাল ডিভাইস, বৈদ্যুতিক মেশিন ও যন্ত্রপাতি, ইস্পাত ও লোহাজাত পণ্য, রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য এবং গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ। জাপানে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রফতানি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক খাদ্য (মাছ ও চিংড়ি), হোম টেক্সটাইলস, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষিপণ্য যেমন তাজা সবজি ও ফল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে বাংলাদেশ ১৮৭ দশমিক ৪৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপানে ১৪১ দশমিক ১৫ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে জাপানের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই স্টকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ দশমিক ৯৬ কোটি ডলারে। আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত জাপানের প্রতিশ্রুত ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২৩২ কোটি ডলার। একই সময় পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি ডলার।
জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা যাচাই করতে গঠিত যৌথ গবেষণা দলের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিটি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। তবে পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সক্ষমতায় অগ্রসর, অন্যদিকে বাংলাদেশ শ্রমঘন শিল্প ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দুই দেশের অর্থনীতি একে অন্যের পরিপূরক। এক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ ইপিএ স্বাক্ষরিত হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বহু গুণে বাড়বে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। এতে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এ প্রেক্ষাপটে একটি ইপিএ বাংলাদেশের রফতানি খাতকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
যৌথ গবেষণা দল আলোচনার জন্য মোট ১৭টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য বাণিজ্য ও বাজার প্রবেশাধিকার, রুলস অব অরিজিন, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদসংক্রান্ত মান, প্রযুক্তিগত বাধা, সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, প্রতিযোগিতা নীতি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, সরকারি ক্রয়, শ্রম ও পরিবেশ, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, অবকাঠামো ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক মান ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থায় দুর্বলতা। অন্যদিকে জাপানের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বিনিয়োগ সুরক্ষা, স্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতি ও স্বচ্ছ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর। যৌথ গবেষণা দলের মতে, এ চুক্তি স্বাক্ষর হলে তা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করবে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াবে এবং টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে। তবে বাংলাদেশকে এজন্য অভ্যন্তরীণ নীতি, আইনি কাঠামো ও বাণিজ্য সহায়ক অবকাঠামোতে সংস্কার ও উন্নয়ন আনতে হবে।










