আগামী বাজেটে পিছিয়ে পড়া মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারী ও শিশুদের সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা।
আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক্-বাজেট সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
অনুষ্ঠানে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪০ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে তিন ধাপে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে এবং আগামী ১৫ জুনের মধ্যে তা শেষ করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, তথ্য সংগ্রহে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে যুক্ত করা হয়নি। ইউনিয়ন সমাজকর্মী, সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, পরিবার কল্যাণ কর্মী, স্বাস্থ্য সহকারী ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকদের সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও সর্বজনীন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ‘এক নাগরিক, এক কার্ড’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
নারীদের অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পরিবারে নারীদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বাড়াতে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যাতে তারা সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, খাবার বা ছোটখাটো আয়মুখী কাজে অর্থ ব্যবহার করতে পারেন।
প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৯ লাখ নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী রয়েছেন। তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, সহায়তা ও বিশেষ বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধেও আগামী বাজেটে গুরুত্ব বাড়ানো হবে।
জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে। অতীতে দীর্ঘসূত্রতা ও একাধিক সংশোধনের অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসতে সময়সীমা নির্ধারণ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট হবে ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক ঋণের দায় এবং নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে বাজেট প্রণয়ন কঠিন হয়ে উঠেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার এখনো অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে সমন্বিত মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। গত কয়েক মাসে সংকট মোকাবেলায় কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরো বলেন, সরকার সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচিতে গুরুত্ব দিলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, ঋণনির্ভর উন্নয়ন ব্যয় এবং বাস্তবায়নহীন প্রকল্প ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি কর সংস্কার, কর ছাড় যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি রোধ ও ডিজিটাল কর ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আরো আধুনিক ও দক্ষ, করনীতিকে অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা, প্রকল্প বাছাই, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেয়া এবং সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারকে একদিকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।










