জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারীরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করলেও নীতি নির্ধারণ ও সুশাসনের কাঠামোতে তারা এখনো প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছেন। আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সামরিক জাদুঘরে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ (এমজেএফ) আয়োজিত ‘জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন ২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
'জেন্ডার সংবেদনশীল জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য কণ্ঠস্বর' প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ জাতীয় সম্মেলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।
সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হতে পারে না। এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায় এবং অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। তিনি আরো বলেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে অধিকার ও সেবা নিশ্চিতে কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। জ্বালানি নীতি ও রূপান্তরে তাদের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় না নিলে সুফল সীমিত থাকবে। তার মতে, জ্বালানি হতে হবে পরিষ্কার, সবুজ এবং মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত।

প্রথম অধিবেশন নারীর ক্ষমতায়নের আলোকে জ্বালানি নীতি ও সুশাসন শীর্ষক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এমজেএফের রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রামসের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী। তিনি বলেন, কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো রূপান্তর ন্যায্য হতে পারে না।
অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ ঘরোয়া রান্নার জ্বালানিকে আবশ্যিক প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের পরিবেশ ও জ্বালানি কর্মসূচির ব্যবস্থাপক তানজিনা দিলশাদ বলেন, জ্বালানি খাতে বাস্তবায়ন পর্যায়ের বিভিন্ন ভূমিকায় নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। তিনি জানান, নারীবান্ধব নীতি প্রয়োজন, যেখানে ক্যারিয়ারের বিরতি স্বীকৃতি পাবে, কাঠামোগত বৈষম্য কমবে এবং নারীরা বাধাহীনভাবে অংশ নিতে পারবেন।
দ্বিতীয় অধিবেশন পাওয়ার ইক্যুয়ালিটি বিজনেস শীর্ষক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ইউএন উইমেনের জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচির বিশেষজ্ঞ দিলরুবা হায়দার। তিনি বলেন, দ্রুতগতির জলবায়ু সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জরুরি সমাধান হিসেবে সামনে এনেছে। তবে এ খাতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পুরুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণও দরকার।
সুইডেন দূতাবাসের ইনক্লুসিভ ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের সেকেন্ড সেক্রেটারি ফ্রেড্রিকা নোরেন বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন থেকে শুরু করে অর্থায়নে প্রবেশাধিকার পর্যন্ত জেন্ডার সংবেদনশীল রূপান্তরের জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি নারীদের জন্য বিনিয়োগে প্রবেশাধিকার সহজ করা, জাতীয় ও খাতভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত তহবিল গঠনের সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে অর্থায়ন কাঠামোতে জেন্ডার সংবেদনশীলতাকে মূল উপাদান হিসেবে রাখার কথা বলেন।
তৃতীয় অধিবেশন নারীর ক্ষমতায়নের কাঠামোতে জ্বালানি নীতি ও সুশাসন শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ফাহিমা নাসরিন মুন্নি বলেন, জ্বালানি খাতে নারীর উপস্থিতি খুবই কম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষদের আধিপত্য স্পষ্ট। জলবায়ু বাস্তবতায় নারীর অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন আরো বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ক্ষমতায় গেলে জ্বালানি খাতে নারীদের সংকট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির মুখ্য যুগ্ম সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কথা বলেন এবং নারীর ক্ষমতায়ন জোরদারে কাজ করার আশাবাদ জানান। জাতীয় পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহ সভাপতি এবং ঢাকা দশ আসনের মনোনীত প্রার্থী বহ্নি ব্যাপারী নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বায়োগ্যাসকে কার্যকর সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি দলীয় আলোচনার ভেতরে থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয় এগিয়ে নেয়ার কথা বলেন। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা সংগঠনের সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, আলোচনা থেকে এখন অঙ্গীকারে যেতে হবে এবং জলবায়ু ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ইশতেহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা প্রয়োজন।
সম্মেলনে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেন, ফর দ্য লাইটের প্রতিষ্ঠাতা নাভিদ হাসান, ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদীসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।









