অবৈধ বাসের প্রতিযোগিতার কারণে সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে এবং যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। বাসের নিবন্ধন ও পারমিট না থাকায় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএর তদারকির অভাবে চাঁদপুর পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এ রাজস্ব ঘাটতি আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, চাঁদপুর জেলা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন সাত শতাধিক যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। এসব বাসের অর্ধেকেরও বেশির রোড পারমিট, ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। পরিবহন কোম্পানিগুলো গড়ে ১০-১২টি বাসের অনুমোদন নিয়ে পরিচালনা করছে ৫০-৬০টি।

চাঁদপুর-হাজীগঞ্জ-কচুয়া-ঢাকা রুটে আল-আরাফাহ এক্সপ্রেসের ৬০টি, আল-আরাফাহ স্পেশালের ৩০টি ও সুরমা পরিবহনের প্রায় ২০০টি বাস চলে। চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটে বোগদাদ পরিবহনের ৯০টি ও আইদির ৪০টি বাস চলছে। চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী রুটে আনন্দ পরিবহনের ৩০টি বাস যাতায়াত করে।

বাবুরহাট-মতলব-ঢাকা রুটে জৈনপুরী পরিবহন ও এক্সপ্রেসের ১০০টি ও মতলব এক্সপ্রেসের ৫০টি বাস চলে। এছাড়া চাঁদপুর-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে সততা, একতা, সৌদিয়া, ইলিশের বাড়ী চাঁদপুর, হিলশা ও রূপসী চাঁদপুর পরিবহনের ৫০টি বাস চলাচল করছে।

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি যাত্রীবাহী বাসকে রোড পারমিট, ফিটনেস, টেস্ট টোকেন ও আয়কর বাবদ বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা রাজস্ব জমা দিতে হয়। চাঁদপুর থেকে চলাচলকারী অবৈধ বাসগুলো রাজস্ব না দেয়ায় সরকার প্রতি বছর অন্তত ৪ কোটি টাকা আয় হারাচ্ছে।

চাঁদপুর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী কতটি বাসের রোড পারমিট ও ফিটনেস আছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই জেলা বিআরটিএ অফিসে। জেলা প্রশাসন থেকে চারটি পরিবহনের ৩৪টি বাসের বিশেষ অনুমোদন রয়েছে। বেশির ভাগ বাসের রোড পারমিট ও কাগজপত্রের স্বচ্ছতা নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন অধিকাংশ বাস শ্রমিক ও মালিক পক্ষ।

চাঁদপুরে ২০১১ সাল থেকে নতুন করে কোনো বাসের রোড পারমিট দেয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে বাস মালিকসংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারকে তারা ইনকাম ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছেন, অথচ রোড পারমিট পাচ্ছেন না। এতে গাড়ি নিয়ে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। একই কারণে যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়ে।

কাগজপত্র না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাস মালিক ও শ্রমিকরা। বাস মালিকরা জানান, বর্তমানে সড়কে মানুষের তুলনায় গাড়ি বেশি। রোড পারমিট যে কয়টি আছে, তার চেয়ে পাঁচ-ছয় গুণ বাস চালানো হচ্ছে।

আল-আরাফাহ এক্সপ্রেসের ম্যানেজার ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমরা বিআরটিএতে আবেদন জমা দিয়ে রেখেছি। টার্মিনাল বা রাস্তা সংস্কার হলে কাগজের অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, তাদের পারমিট থাকা সত্ত্বেও কচুয়া ও সাচারে গাড়ি বন্ধ রেখে কর্মীদের হয়রানি করা হয়। আল-আরাফাহ স্পেশালের পারমিট নেই, তবে সুরমা ও এক্সপ্রেসের পারমিট রয়েছে।

বাসচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি ঢাকা-চাঁদপুর রুটে পদ্মা এক্সপ্রেস চালাই। এখন সমস্যা হইছে, এই পথেঘাটে যে ধরনের গাড়ি চলে, এদের কোনো রোড পারমিট নাই। একটা সার্ভিসের সঙ্গে দুই-তিনটা সার্ভিসের পাল্লা চলে। যার কারণে যাত্রী ও গাড়ির সমস্যা হয়। সরকারও ঠিকমতো রাজস্ব পায় না।’

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি এমএ লতিফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়কে রোড পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা যানবাহনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। অবৈধ গাড়িগুলো সড়কে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। এতে সড়কে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা চাই, অবৈধ গাড়ি সড়ক থেকে উঠিয়ে বৈধগুলোকে সুষ্ঠুভাবে চলাচল করার ব্যবস্থা করা হোক। তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।’

হাজীগঞ্জ বাজারের ট্রাফিক পুলিশ জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী কচুয়া সড়ক দিয়ে পারমিট থাকা গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো গাড়ি যেতে দেয়া হচ্ছে না।

চাঁদপুর বিআরটিএ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) আবদুল্লাহ আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অফিসে অবৈধ পরিবহনের তালিকা নেই। বৈধ-অবৈধ বাসের তালিকা ঢাকা ও কুমিল্লা অফিসে পাওয়া যাবে। অনেক আগে আমরা আল-আরাফাহর ১০টি বাসকে অনুমতি দিয়েছিলাম। এর পরে কোনো বাসের পারমিট দেয়া হয়নি। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবৈধ বাসের তালিকা তৈরি করে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। পারমিট ছাড়া বাস চললে সরকার রাজস্ব ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মোবাইল কোর্ট সচল আছে। দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পারমিট ও ফিটনেস নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি মানুষের ভোগান্তি কমবে।’