তেহরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ও বিশেষ অনুমোদিত দেশের জন্য এ জলপথ খোলা থাকবে। ইরানের এ বন্ধু তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরাক ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ বলে পশ্চিমা গণমাধ্যম যে দাবি করে আসছে, তা সত্য নয়। অনেক দেশের শিপিং কোম্পানি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপদ যাতায়াতের অনুরোধ জানিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যাদের বন্ধুরাষ্ট্র মনে করি বা অন্য কোনো কারণে অনুমতি দিয়েছি, আমাদের সশস্ত্র বাহিনী তাদের জাহাজের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করছে। তবে যারা এ যুদ্ধে সরাসরি জড়িত বা শত্রুপক্ষ হিসেবে বিবেচিত, তাদের জাহাজ এ পথে চলতে দেয়া হবে না।’
এছাড়া মালয়েশিয়ার জাহাজও হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি পেয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর তাদের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর দিকে ইরানকে ‘গুরুত্ব’ দিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলায় ইরান সামরিকভাবে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। তারা একটি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে তেহরান এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তাদের মূল নীতি প্রতিরোধ গড়ে তোলা, আলোচনা নয়। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরা।
ট্রাম্পের মতে, ইরান এখন চুক্তির জন্য ‘ভিক্ষা’ করছে, কিন্তু তাদের আলোচনার ধরন অত্যন্ত "অদ্ভুত" ও ভিন্নধর্মী। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখনই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না নিলে সামনে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আসবে যেখান থেকে আর ফেরার পথ থাকবে না।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ বজায় রাখাই তাদের প্রধান নীতি। পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের পাঠানো প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আরাগচি একে কোনো প্রথাগত"আলোচনা"বা সংলাপ হিসেবে মানতে নারাজ। তার মতে, বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান বা নিজেদের অবস্থান জানানো কোনোভাবেই আনুষ্ঠানিক কূটনীতি নয়। ইরান সমঝোতার টেবিলে বসার ইচ্ছা পোষণ করছে না বলে জানান তিনি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘পরোক্ষ বার্তা বিনিময়’ চলছে। তুরস্ক ও মিসরও মধ্যস্থতায় সহায়তা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, পাকিস্তান শান্তি রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ অঞ্চলে ও এর বাইরে স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাতি জানিয়েছেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পাশাপাশি কায়রোও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে সহায়তা করছে। এছাড়া আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পরিচালিত বৃহত্তর মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাতেও মিসর সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত ছেড়ে দেয়ার মতো শর্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। বিপরীতে ইরান দাবি করেছে, ভবিষ্যতে সামরিক হামলা না করার নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও হরমুজ প্রণালির তেহরানের নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানিয়েছে তেহরান।
কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌপ্রধান আলীরেজা তাংসিরিকে হত্যার দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। ইরানের সমুদ্রসীমা রক্ষা ও বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের প্রধান কারিগর ছিলেন আলীরেজা। সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অবরোধ ও কঠোর নজরদারিতে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। কাটজের দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করার পেছনে মূল পরিকল্পনাটি ছিল তাংসিরির। তাই তাকে সরিয়ে দেয়া ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের একটি বড় অংশ ছিল।
কাটজের এ বক্তব্যকে সমর্থন করে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু। হিব্রু ভাষায় দেয়া এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, তাংসিরিকে হত্যা করা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘সহযোগিতার আরেকটি উদাহরণ’। তবে এ দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ইরানের বান্দার আব্বাস ও শিরাজ শহরের আবাসিক এলাকায় যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ও ওয়াশিংটনের চাপে ইসরায়েল বর্তমানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পার্লামেন্ট স্পিকারকে তাদের আক্রমণ তালিকা থেকে সাময়িকভাবে বাদ রেখেছে, যাতে ভবিষ্যতের আলোচনার পথ একদম বন্ধ হয়ে না যায়। প্রায় এক মাস ধরে চলা এ যুদ্ধে ইরানে অন্তত ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৪০ নারী ও ২১২ শিশু। আহত হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৩২ লাখ মানুষ। সেই সঙ্গে লেবাননেও প্রায় ১০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
বিপরীতে ইরানও ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি গতকাল জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযানের ৮২তম ধাপ শুরু করেছে। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ডেড সির দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত ইসরায়েলের পারমাণবিক অবকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসরায়েলের হাইফা বন্দর।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম গতকাল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১০৭ দশমিক ৫৪ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল সূচক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৯৪ দশমিক ৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় বাজারে দামের এ অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে। অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তা জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।










