যশোরে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের খাবারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারিভাবে প্রতিদিন রোগীপ্রতি ৩০০ টাকা খাবারের বরাদ্দ থাকলেও রোগীরা ১০০ টাকার খাবার পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। সরবরাহকৃত খাবারের মানও ভালো না। অনেক সময় বিড়ালে খাওয়া খাবারও রোগীদের মাঝে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় অধিকাংশ রোগী বাড়ির খাবারের ওপর নির্ভর করলেও বিপাকে রয়েছেন ভারতফেরত রোগীরা। কেননা তাদের বাইরে থেকে খাবার দেয়ার মতো কেউ নেই। হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলেছেন, খাবারে অনিয়মের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল হাসপাতালের রেডজোনে ৬৫ জন করোনায় আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ভারত ফেরত ১২ নারী-পুরুষ রয়েছেন। তাদের উন্নতমানের কোনো খাবার দেয়া হচ্ছে না। ৪২ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন ভারত ফেরত আল মামুন জানান, ১৫ আগস্ট তিনি এ হাসপাতালে এসেছেন। ছয়দিনের মধ্যে শুক্রবার দুপুর ও রাতের খাবারে ছিল ছোট ছোট দু-তিন টুকরা ব্রয়লার মাংস। রান্নার মান এতটা নিম্নমানের মুখে দেয়া যায়নি। বর্তমান বাজারদরে তিন বেলার খাবারের দাম ১০০ টাকার বেশি হবে না।

৪৩ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন আল আমিন জানান, তিন বেলা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার দেয়ার কথা থাকলেও ছয়দিনে কোনো ফলমূল দেয়া হয়নি। তিনি আরো জানান, ফলমূল ছাড়াও সরকারি বরাদ্দের টাকায় নিয়মিত দুধ হরলিক্স দেয়ার কথা, কিন্তু কেউ পাচ্ছেন না।

৪৪ নম্বর বেড়ে চিকিৎসাধীন আকাশ জানান, নিজে বা স্বজনদের কেউ অসুস্থ হওয়ার সুবাদে বাগেরহাটসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে গিয়েছি, খাবার খেয়েছি। কিন্তু এ হাসপাতালের মতো নিম্নমানের খাবার কোথাও চোখে পড়েনি। আরেক রোগীর স্বজন শিরিনা বেগম জানান, আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের নিম্নমানের খাবার অনেকের খেতে হয়। যে পরিমাণে ভাত দেয়া হয় তাতে রোগীর পেট ভরে না।

সরেজমিনে অবস্থান করে দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদাভাবে উন্নতমানের খাবার রান্নার কথা খাকলেও মানা হচ্ছে না। অন্য রোগীদের খাবারের সঙ্গে এক সঙ্গেই রান্না করা হচ্ছে। পার্থক্য হলো সাধারণ রোগীদের জন্য এক টুকরা মাছ ও করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ দুই টুকরা মাছ। রেডজোনে গিয়ে দেখা গেছে, একজন রোগীকে সকালের নাসতায় ৫ টাকা দামের এক পিস পাউরুটি, ৮ টাকা দামের একটি ডিম ও ৩-৪ টাকা দামের একটি কলা দেয়া হয়। দুপুরে এক প্লেট ভাতের সঙ্গে সবজি ছাড়াই দুই টুকরা মাছ। রাতেও দেয়া হয় একই খাবার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সেবিকা জানান, করোনা রোগীদের দেয়া খাবারের মান ভালো না। পুষ্টিসমৃদ্ধ কোনো খাবার দেয়া হয় না।

গতকাল রেডজোনে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীদের জন্য রাখা খাবার খাচ্ছে বিড়ালে। পরে সে খাবার রোগীদের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের অনেক সময় তরল খাবারের প্রয়োজন হলেও তা দেয়া হয় না। অথচ তাদের জন্য খাবারের টাকা সরকারিভাবে বরাদ্দ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেডজোনে চিকিৎসাধীন এক রোগী জানান, প্রায় দিন পাউরুটি শক্ত হয়ে যায়। কলাও নিম্নমানের। তরকারি রান্না হয় না। করোনা রোগীদের জন্য সরকারের দেয়া খাবারের টাকা রীতিমতো লুটপাট করা হচ্ছে। ঠিকাদার ও দায়িত্বরতরা ওই টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন বলে দাবি করেন ওই রোগী।

ঠিকাদার হাফিজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আমরা রোগীদের খাবারে ফাঁকি দিচ্ছি না। চেষ্টা করছি ভালোমানের খাবার দেয়ার।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরিফ আহমেদ জানান, তিন বেলা খাবারবাবদ প্রতি করোনা রোগীর জন্য বরাদ্দ ৩০০ টাকা। তাদের উন্নতমানের খাবার দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। খাবার নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি জানলাম। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান জানান, রান্নার মান ও খাবারে অনিয়মের ব্যাপারে কেউ তার কাছে অভিযোগ করেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।