জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুইদিন আগে আজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে হওয়া এ চুক্তি নির্বাচিত সরকারের জন্য কোনো বোঝা হবে না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। পাশাপাশি তিনি শুল্ক কমার আশাও প্রকাশ করেছেন।

সচিবালয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘যে ৩৭ শতাংশ ট্যারিফ আমাদের ওপর আরোপ হয়েছিল, সেটাকে আমরা নেগোশিয়েট করে ২০ শতাংশে নামিয়েছিলাম। যদি আমাদের এ চুক্তি প্রকাশিত না হতো, আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে আমরা ২০ শতাংশের থেকেও কম পেতাম। দুঃখজনকভাবে আমরা ওখানে বিব্রত হয়েছি। পৃথিবীতে একমাত্র দেশ, যেখান থেকে এ চুক্তির শর্তগুলো সারা দুনিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। তার পরও আমরা তাৎপর্যপূর্ণভাবে ট্যারিফ ২০ শতাংশে নামিয়ে এনেছি।’

চুক্তির তারিখের বিষয়টি ৯ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছিলাম যে আরো কত কমানো যায়। কতটুকু কমবে আমি এ মুহূর্তে বলতে পারছি না বা চাচ্ছি না। আমরা আলোচনার ভিত্তিতে দেখব। সামগ্রিক শুল্ক কমানোর চিন্তা করছি তা নয়, প্রচেষ্টা রয়েছে আমাদের যে মূল পণ্য গার্মেন্টস (তৈরি পোশাক), এ জায়গায় যেন শুল্ক শূন্য হয়। আমরা সে প্রচেষ্টায় এখনো রয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ কোটি টাকার রফতানি সম্ভাবনা রয়েছে। এটা ব্যাপক হারে বাড়র সম্ভাবনা আছে। এ সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের মাত্র দুইদিন আগে এমন বড় চুক্তি কেন জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ‘আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবে, সেই নির্বাচিত সরকারকে চাপমুক্ত রাখতেই অন্তর্বর্তী সরকার এ চুক্তি সম্পন্ন করে যাচ্ছে।’ চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি স্বাক্ষর শেষে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে বলেও তিনি জানান।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত বছরের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর উচ্চহারে পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশসহ অনেক দেশই শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করে। কোনো কোনো দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্কহার শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। এর এক সপ্তাহের মাথায় গত বছরের ৯ এপ্রিল বাড়তি শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেন ট্রাম্প।

তবে তার দুইদিন আগেই বাংলাদেশী পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চিঠি পাঠান ডোনাল্ড ট্রাম্প। চিঠিতে তিনি বলেন, আগামী ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বাংলাদেশী সব পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এ শুল্ক বর্তমানে খাতভিত্তিক যে শুল্ক দেয়া হয়, তার অতিরিক্ত হিসেবে প্রযোজ্য হবে। ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো হলে সেখানেও এ শুল্ক প্রযোজ্য হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

কয়েক দফা আলোচনার পর গত বছরের আগস্টে হোয়াইট হাউজের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর শুল্কহার আরোপ করা হয় ২০ শতাংশ। এর পর থেকে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তি নিয়ে প্রথম দুই দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি পণ্য আমদানির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনাসহ বেশকিছু বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা-সংক্রান্ত শর্ত দিয়েছিলেন দেশটির কর্মকর্তারা। যার অংশ হিসেবে দেশটি থেকে গম, তুলা, এলএনজি ও উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংকে প্রাথমিকভাবে ২৫টি ওয়াইড বডি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবও দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া চুক্তির প্রাথমিক প্রস্তাবের জবাবে এসব প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। যার ওপর ভিত্তি করে তৃতীয় দফা আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই ২০ শতাংশের ঘোষণা আসে।

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশী রফতানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকপণ্য রফতানিতে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ হারে শুল্ক নিয়েও ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় বেশি ছিল। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থমূল্য বিবেচনায় দেশটিতে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে আজ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে। দুই দিনব্যাপী এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত থাকছেন না বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি দল গিয়েছে ওয়াশিংটনে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩ ফেব্রুয়ারি দলের সদস্যদের নামে যে সরকারি আদেশ (জিও) জারি করেছে, তাতে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তির জন্য এবারের সফরকারী দলের প্রধান হচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনুবিভাগের প্রধান খাদিজা নাজনীন। অন্য চারজনের মধ্যে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ঢাকায় বসে এরই মধ্যে এ চুক্তিতে সই করেছেন। সই করা কপি বাংলাদেশের দলটি ওয়াশিংটনে নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সই করতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিয়েসন গ্রিয়ার।