২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ তৈরি করা হয়। এ আইনের অধীনে ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। এ কর্তৃপক্ষ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। চেয়ারম্যান ও চার জন সদস্য নিয়ে কর্তৃপক্ষ। এ পাঁচ জন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠার ১০ বছরে কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন মাত্র ৯২৯টি। তাও সেটি শুরু হয়েছে ২০১৯ সাল থেকে। তার আগে কোনো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়নি। সাত বছরে জরিমানা করা হয়েছে ১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। জরিমানার আওতায় এসেছেন ৯২৪ জন ব্যক্তি। কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে মাত্র ১৭ জনকে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ২৪৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময়ে ২৬২ জন ব্যক্তি বিচারের আওতায় এলেও কাউকে কারাদণ্ড দেয়া হয়নি। শুধু জরিমানা করা হয়। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ১৬৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ১৩৬ জন ব্যক্তি বিচারের আওতায় এলেও কাউকে কারাদণ্ড দেয়া হয়নি। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ১৬৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ১৪১ জন ব্যক্তি বিচারের আওতায় এলেও কাউকে কারাদণ্ড দেয়া হয়নি। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ১৬২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ১৫৭ জন ব্যক্তি বিচারের আওতায় এলেও কাউকে কারাদণ্ড দেয়া হয়নি। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৩৪টি মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করে ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ১৪১ জন ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা হয়। কারাদণ্ড দেয়া হয় ১৩ জনকে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৫৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ৮৭ জন ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা হয়। কারাদণ্ড দেয়া হয় চারজনকে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০১৮-২০১৯ ও ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে কারাদণ্ড দিলেও পরের বছরগুলোতে আর কাউকে কারাদণ্ড দেয়নি।

এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুব কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরের বছরগুলোতে একটা ল্যাব টেস্টও করেনি ফুড সেফটি অথরিটি। মামলা হয়নি। আগের মামলার ফলোআপ হয়নি। কাজেই কারাদণ্ড হবে কীভাবে।’

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত হয়। দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কী শাস্তি প্রদান করা হবে সেটি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নির্ধারণ করেন। অপরাধের মাত্রার ওপর নির্ভর করে শাস্তি প্রদান করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ বিচক্ষণতা প্রয়োগ করেন।’

বর্তমানে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে পাঁচ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্মরত রয়েছেন।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ছাড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নিরাপদ খাদ্য আইনে জরিমানার বিধান রয়েছে কিনা জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জরিমানার বিধান রয়েছে। ২০১৪ সালে প্রণীত প্রশাসনিক জরিমানার বিধি আরোপের জন্য কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নজরে এসেছে। প্রশাসনিক জরিমানা কেন প্রয়োগ করা হয়নি এবং তা চালু করার বিষয় যাচাই করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মুস্তাক হাসান মো. ইফতেখার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট বিশেষ অবস্থায় পরিচালনা করার জন্য চালু হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর আগে। বাংলাদেশে মোবাইল কোর্ট আইনে অনেক আইনের হালকা অপরাধ মূলত বিচার করা হয়। এটা অযৌক্তিক। যখন প্রকৃত অর্থে একটি পদ্ধতি চালু করা যাচ্ছে না বা যখন দায়িত্বহীনতা মাত্রা ছেড়ে যায়, তখন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে সস্তা সমাধান দেয়া হয়। অনেকে খুশিও হয়। নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা সে কারণে অর্থহীন। উপরন্তু, এটা এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান দিচ্ছে না, দেবেও না। পরিসংখ্যান থেকেই প্রমাণিত যে এত সাজা দিয়ে এত জরিমানা করে ভেজাল বা দূষণ কি কমেছে? নিরাপদ খাদ্য আইনে এর চেয়ে অনেক ফলপ্রসূ সমাধান আছে। তা প্রয়োগ করা হচ্ছে না বা ইচ্ছেও নেই।’