নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার সেলিম বাজারে প্রতিদিন ভোরে মাত্র ২ ঘণ্টার হাটে কোটি টাকার সবজি বিক্রি হচ্ছে। একসময়ের এক ফসলি জমিতে এখন সর্জন পদ্ধতিতে বছরজুড়ে নানা জাতের সবজি উৎপাদন করছেন স্থানীয় কৃষকরা। তবে ভালো ফলন ও বেচাকেনার পরও পিছিয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের কৃষক। এর জন্য অনুন্নত সড়ককেই দায়ী করছেন তারা। কৃষকদের অভিযোগ, অনুন্নত সড়ক ব্যবস্থার কারণে বড় পাইকাররা বাজারে আসেন না। পাশাপাশি চড়া দামের কৃষি উপকরণ, নদীভাঙন ও কৃষি বিপণন বিভাগের তদারকির অভাবকেও দায়ী করেন তারা। তাদের মতে, হাড়ভাঙা খাটুনির পরও এসব কারণে ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা।

উপজেলার পূর্বচরবাটা ও চরক্লার্কের সীমান্তবর্তী সেলিম বাজারে প্রতিদিন ভোরে বসে এ বিশাল পাইকারি হাট। কাকডাকা ভোরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক ব্যস্ত চিত্র। কেউ মাথায় সবজির আঁটি নিয়ে আসছেন। কেউ রিকশা বা ভ্যানে সাজিয়ে আনছেন নানা জাতের সবজি। মাথায় কিংবা ভ্যানে থাকা অবস্থাতেই চলে পাইকারদের দরদাম। ভোর ৫টা থেকে শুরু হয়ে সকাল ৭টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় বেচাকেনা। এরপর ফাঁকা হয়ে যায় এ বাজার।

বাজার পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, ভরা মৌসুমে এ হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার সবজি বেচাকেনা হয়। এমনকি মৌসুমের মাঝামাঝি সময়েও এখানে প্রতিদিন ৪০-৪৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু কোটি টাকার এ বাজারের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না কৃষক।

48

সেলিম বাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন জানান, উপজেলার মোহাম্মদপুর, চরক্লার্ক, পূর্ব চরবাটা ও হাতিয়ার উত্তর অংশের বিভিন্ন চরে গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে সর্জন পদ্ধতিতে সবজি চাষ হচ্ছে। আগে এসব জমিতে কেবল আমন ধান হতো। এখন বছরজুড়েই উৎপাদন হচ্ছে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, শিম, করলা, ঢ্যাঁড়শ, টমেটো, শসা, চিচিংগা ও বিভিন্ন জাতের বেগুনসহ নানা রকম শাক।

তিনি আরো জানান, বিপুল উৎপাদনের কারণে এলাকায় একাধিক পাইকারি বাজার গড়ে উঠেছিল। সোলেমান বাজার, কালাধুর বাজার ও সেলিম বাজার ছিল প্রধান। তবে গত পাঁচ-ছয় বছরে হাতিয়ার বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। এর মধ্যে দুই-তিন বছরে দুটি বাজারও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে এখন সেলিম বাজারই চরাঞ্চলের একমাত্র বড় পাইকারি হাট হিসেবে টিকে রয়েছে। শীত মৌসুমে এ বাজারে প্রতিদিন সর্বনিম্ন ১ কোটি টাকার বেচাকেনা চলে।

কৃষকরা জানান, তারা এখন সর্জন পদ্ধতিতে বছরব্যাপী সবজি চাষ করছেন। ফলন ভালো হলেও কয়েক বছর ধরে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি নেই। গ্রামের রাস্তাঘাট নষ্ট হওয়ায় বড় পাইকার ও বড় গাড়ি বাজারে আসে না। ফলে স্থানীয় পাইকারদের কাছে কম দামে সবজি বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের লোকজনকে বাজারে তদারকি করতে দেখা যায় না বলেও অভিযোগ করেন তারা।

পাইকারি ব্যবসায়ীরাও সড়ক সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। পাইকার নজিব উল্যাহ জানান, ভাঙাচোরা সড়কের কারণে বড় কাভার্ড ভ্যান আসতে চায় না। প্রায়ই গাড়ি বিকল হয় এবং জ্বালানি খরচ বেশি লাগে। তাই তারা ছোট পিকআপ ভ্যান নিয়ে আসেন। আবার সময়মতো পণ্য নিয়ে দূরের খুচরা বাজারে পৌঁছানো যায় না। ফলে ব্যবসায় ক্ষতি এড়াতে তারাও কম দামে সবজি কেনেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বছরে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৪২ হেক্টর জমিতে নানা জাতের ৬ লাখ ১২ হাজার ৯৫৮ টন সবজি উৎপাদন হয়। তবে এর বাজারমূল্য নিশ্চিত করতে পারেনি কৃষি বিপণন এবং সম্প্রসারণ বিভাগ। এ বিভাগের মতে, জেলা সদরের একাংশ, সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুর, চরক্লার্ক, চরজব্বার, চরজুবলি, হাতিয়ার উত্তরাঞ্চল, কোম্পানীগঞ্জের চরএলাহী, গাংচিল এসব এলাকায় সবজি বেশি উৎপাদন হচ্ছে।

কথা হলে উপজেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাৎ তাদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, লোকবলের সংকট রয়েছে। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশা দেখার সুযোগ কম তাদের। তার ভাষ্য, জেলার বিভিন্ন বাজারে মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতেই তাদের সময় চলে যায়।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নোয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির সম্ভাবনার বিষয়ে তার দপ্তর অবগত। কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজে বাজারজাতের জন্য এরই মধ্যে একাধিক প্রকল্প অধিদপ্তরে জমা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, চরক্লার্ক ও চরজব্বার এলাকার সড়কগুলোর টেকসই উন্নয়নে এসব প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। যেহেতু এখন শুষ্ক মৌসুম, তাই যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কৃষকের স্বপ্নও বাস্তবায়ন হবে বলে মনে করেন তিনি।