কভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দিতে চাইছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিষয়টিতে সায় দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ও। তবে এতে বাদ সাধছে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য, আউটসোর্সিং নয়, নিয়োগ দিতে হবে স্থায়ীভাবে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, স্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় প্রয়োজন, যা এখনকার পরিস্থিতিতে অসম্ভব। এ কারণেই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জরুরি সেবা দিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি চেয়ে গত ২৩ এপ্রিল একটি চিঠি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চিঠিতে সাড়া দিয়ে এক বছরের জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে সম্মতিও জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে ল্যাব ও রেডিওগ্রাফি—এ দুই ধরনের সেবাদানের জন্য ৩৮৬ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর বাইরেও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শূন্যপদে অন্যান্য বিভাগেও জনবল নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। প্রয়োজন অনুসারে সেসব পদেও সাময়িকভাবে নিয়োগ দেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসাসেবার সুবিধার্থে বিশেষ বিবেচনায় আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০১৮ অনুযায়ী বেশকিছু শর্তসাপেক্ষে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এসব নিয়োগের জন্য বেশকিছু শর্তও দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্ত অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য ২৭ হাজার ১৩ টাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং সাভার পৌর এলাকার জন্য ২৫ হাজার ৫৫৮ টাকা ও অন্যান্য এলাকার জন্য ২৪ হাজার ৮৭৫ টাকা হারে নিয়োগপ্রাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের মাসিক ন্যূনতম সেবামূল্য পরিশোধ করতে হবে। সেবাকর্মীর মাধ্যমে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস কমিশনের হার ন্যূনতম ৫ শতাংশের কম হবে না। এছাড়া আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবাদাতার সেবামূল্য তার নিজ নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে সেবা ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে হবে। এ সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০০৮-এর বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। এ নিয়োগের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যা সংশ্লিষ্ট আদেশ জারির তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।
বিষয়টির বিরোধিতা করে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমটিএ) সদস্য সচিব আশিকুর রহমান বলেন, কভিড-১৯ টেস্ট বিশ্বাসযোগ্য না হলে ও কঠোরভাবে এর মান নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বা ভুল রোগ নির্ণয়ের ফল হবে ভয়াবহ। শর্তসাপেক্ষে এক বছরের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে আমরা তার বিপক্ষে। আমরা মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদে স্থায়ী নিয়োগের দাবি করেছি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী, প্রতি চিকিৎসকের বিপরীতে পাঁচজন করে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকা বাঞ্ছনীয়। যদিও বাংলাদেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছে প্রতি চারজন চিকিৎসকের বিপরীতে একজন করে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ের হাসপাতালে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে ৭ হাজার ৯২০টি। এসব পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৫ হাজার ১৮৪ জন। খালি রয়েছে ২ হাজার ৭৩৬টি পদ। খালি পদের মধ্যে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ফার্মেসি) পদ সবচেয়ে বেশি ফাঁকা রয়েছে। এছাড়া ল্যাব পর্যায়ে ২ হাজার ২৩৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৪৮৮ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে দেড় লাখ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের চাহিদা রয়েছে। চাহিদার তুলনায় খুবই কম লোকবল থাকায় সঠিকভাবে রোগীর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে না। আবার অনেকের দক্ষতার ঘাটতিও রয়েছে। ফলে কভিড-১৯ টেস্টের ক্ষেত্রে সঠিক ফল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ ও তা ল্যাবে পরীক্ষা করা পর্যন্ত যেকোনো একটি পর্যায়ে দুর্বলতা থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদে সরকারি নিয়োগও বন্ধ রয়েছে ১০ বছর ধরে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনেক পদ খালি আছে। এখন সেসব পদে প্রচলিত নিয়োগবিধি মেনে নিয়োগ দিতে চাইলে সময় প্রয়োজন। এখনকার প্রেক্ষাপটে সেটি সম্ভব নয়। সেজন্যই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। সেটি পাওয়া গেছে। খুব শিগগিরই এসব পদে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশেনের আপত্তির বিষয়ে তিনি বলেন, নিয়োগ পেলে এসব পদে তাদের কাজ শুরু করা উচিত। এতে তাদের অভিজ্ঞতা অর্জন হবে। পরে যখন স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হবে, মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনা করবে।









