তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে সরকার “জিরো টলারেন্স” নীতি বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বিশ্ব মানব পাচার বিরোধী দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘ট্রাপেড বিহাইন্ড দ্য স্ক্যাম: এনডিং হিউম্যান ট্রাফিকিং ফর ফোর্সড ক্রিমিনালিটি’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মানব পাচারের ধরন পরিবর্তনশীল ও জটিল। অপরাধী চক্রগুলো এখন কেবল প্রচলিত উপায়ে নয়, বরং ডিজিটাল মাধ্যম, ভুয়া অনলাইন নিয়োগ প্লাটফর্ম ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণ সমাজ ও চাকরিপ্রার্থীদের ফাঁদে ফেলছে। আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান ও উন্নত ভবিষ্যতের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে তারা সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি হয়ে চরম নির্যাতন, ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে বাধ্য হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মানব পাচার চক্র এখন বিভিন্ন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। এ হুমকি মোকাবেলায় কেবল প্রথাগত আইন-শৃঙ্খলাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, অর্থলগ্নি সংস্থা, বেসরকারি খাত ও সচেতন সমাজকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
মানব পাচার প্রতিরোধে বর্তমান সরকারের নানা পদক্ষেপ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অপরাধ দমনে সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতি রেখে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে। সরকার প্রণয়ন করেছে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান (প্রতিরোধ ও দমন) আইন, ২০২৬’।
তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম কনভেনশন (ইউএনটিওসি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রটোকলগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত এ নতুন আইনে অনলাইন স্ক্যাম, প্রযুক্তিনির্ভর প্রলোভন ও জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করার মতো আধুনিক অপরাধগুলোকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে “মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা, ২০১৭” যুগোপযোগী করার কাজ চলছে।’
মন্ত্রী জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-৩০)’ চূড়ান্ত করছে, যা প্রতিরোধ, সুরক্ষা, বিচার ও অংশীদারত্ব—এ চার প্রধান স্তম্ভকে আরো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
ভুক্তভোগীদের মর্যাদা ও পুনর্বাসন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মানব পাচারের শিকার প্রতিটি মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এজন্য “ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম)” জোরদার করা হচ্ছে, যাতে ভুক্তভোগীদের দ্রুত উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক আইনি, শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পুনর্বাসন সহায়তা দেয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘তথ্যভিত্তিক নীতি নির্ধারণ এবং নিখুঁত কেস ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে একটি সর্বাধুনিক “ডিজিটাল পাচার প্রতিরোধ তথ্য ব্যবস্থাপনা প্লাটফর্ম” তৈরি করা হচ্ছে।’
তরুণ সমাজ, নারী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং ভুয়া নিয়োগ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য তিনি গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ জাতীয় সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. লিয়াকত আলী মোল্লা, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাইবা জারিনা এবং আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশন ও জাতিসংঘের অভিবাসন নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ড. লরা টম বোন্ডে।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সোহরাব হোসেন ভূঁইয়া।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
এ বছরের বিশ্ব মানব পাচার বিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্যের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন ইউএনওডিসি প্রোগ্রাম অফিস বাংলাদেশের প্রধান শাহ মোহাম্মদ নাহিয়ান।
উদ্বোধনী সেশনের পর একটি তথ্যভিত্তিক ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্ম সচিব রেবেকা খান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ মাদক ও অপরাধ-সংক্রান্ত দপ্তর (ইউএনওডিসি) এবং জাতিসংঘের অভিবাসন নেটওয়ার্কের কাউন্টার ট্রাফিকিং টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। জাতীয় এ সংলাপে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।










