বাংলাদেশের স্বাধীনতার মুহূর্তটিতে মুক্তির অনাবিল আনন্দ ছিল। একই সঙ্গে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জও। জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয় দ্রুত বাণিজ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠার, যাতে করে আমদানি ও খাদ্যসহায়তা সচল রাখা যায়। কিন্তু ওই সময়ের যোগাযোগ ও বন্দর অবকাঠামোর অবস্থা ছিল এর পুরোপুরি প্রতিকূলে। বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দর তখন একেবারেই ব্যবহারের অনুপযোগী। যুদ্ধের সময় বন্দর ও এর আশপাশে অসংখ্য নৌমাইন স্থাপন করেছিল পাকিস্তানিরা। ফলে সে সময় বন্দরে জাহাজ ভেড়া দূরের কথা, এর আশপাশেও নৌচলাচল ছিল অসম্ভব।

ঠিক সে মুহূর্তে এগিয়ে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৭২ সালে সোভিয়েত নৌবাহিনীর একদল নাবিক ও প্রকৌশলী শুরু করে মাইন অপসারণ কার্যক্রম। দুই বছর মেয়াদি এ মাইন অপসারণে অংশ নেন আট শতাধিক সোভিয়েত নৌসেনা। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের সদস্য। বহরের ডুবুরি ও কর্মীরা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে এ কাজে অংশ নেন।

ওই সময় চট্টগ্রাম বন্দরে মুরিং বা নোঙর করার স্থান ছিল ১৮টি। এর মধ্যে ১২টিই যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যায়। বন্দরের কাছে ডুবে যায় ৪০টির বেশি জাহাজ। এমনকি বন্দরের প্রবেশমুখের সড়কটিতেও মাইন পুঁতে রাখা ছিল। তিন মাসের মধ্যেই বন্দর হয়ে ওঠে কার্যক্রম শুরুর উপযোগী। দুই বছরের মধ্যেই বন্দর পুরোমাত্রায় সচল হয়ে ওঠে।

রিয়ার অ্যাডমিরাল স্তানিস্লভ জুয়েনকোর নেতৃত্বে সোভিয়েত নাবিকদের দলটি চট্টগ্রাম বন্দরের পুনরুজ্জীবন ঘটায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশীদের এ-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও দেয় তারা। ভিপি কাজুরিন ও ভিএ মলশানভ নামে দুই নাবিক ওই সময় চট্টগ্রাম বন্দর পুনরায় সচল করে তোলা সোভিয়েত টাস্কফোর্সের অংশ ছিলেন। তাদের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে, অত্যন্ত কষ্টকর প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বন্দরটিকে সচল করে তুলেছেন তারা। নাবিকদের বসবাসের ব্যবস্থা ভালো ছিল না। প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে ঝড়, তীব্র স্রোত, গরম ও সীমাহীন একাকিত্বের সঙ্গে। বন্দরটি সচল করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ইউরি রেডকিন নামে এক সোভিয়েত নাবিক।

চট্টগ্রাম বন্দর সচল করে সোভিয়েত নাবিকরা যখন বিদায় নেন, তখন তাদের সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন স্বয়ং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্থপতি বলেছিলেন, সোভিয়েত নাবিকদের দলটি যদি সহায়তা না করত, তাহলে আমাদের এ নতুন দেশটি অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ত। প্রতিকূল আবহাওয়া ও কষ্টকর জীবনযাত্রার পরও চট্টগ্রাম বন্দর পুনর্নির্মাণের এ বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশ নেয়ায় আমি সব সোভিয়েত নাবিককে ধন্যবাদ জানাই।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে এসেছে। ঐতিহাসিকরাও সে সময় বাংলাদেশের পুনর্গঠনে দেশটির অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও ভূমিকা রয়েছে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের। সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয় দেশটির সহায়তায়। বলা হয়, ২০১৬ পর্যন্তও দেশের এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ এ দুটি কেন্দ্রেই উৎপাদন হয়েছে।

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদান প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাধীনতার পর পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তারা আমাদের সহযোগিতা করেছে। ওই সময় খাদ্যসহায়তা থেকে শুরু করে আমাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে দেশটি। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনী মাইন পুঁতে রাখে। বন্দরকে মাইনমুক্ত করার কাজটি করে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রবেশ নিশ্চিতেও সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেক তত্পর ভূমিকা রেখেছে। এ বিষয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের যে কূটনৈতিক তত্পরতা পরিচালনার দরকার হয়, সে সময় সেই লড়াইটাও সোভিয়েত ইউনিয়ন করেছিল।

যুদ্ধপীড়িত দরিদ্র বাংলাদেশের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন রাজনৈতিক তত্পরতার বাইরে গিয়েও যে অভূতপূর্ব সহায়তা দিয়েছে, সে বিষয় একমত ঐতিহাসিকরা। এছাড়া দেশের তরুণদের শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্বাধীনতার পর সোভিয়েত বৃত্তি নিয়ে সে দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের অনেকেই। ৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত প্রতি বছর এ বৃত্তির আওতায় গড়ে ৫০০ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী দেশটিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন।

এমনই একজন ফজলুর রহমান। ১৯৭৭ সালে বৃত্তি নিয়ে মস্কোর প্যাট্রিস লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন দ্য পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অব রাশিয়া নামে পরিচিত।

কয়েক বছর আগে রাশিয়া বিয়ন্ড নামে এক সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, আমাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে রুশরা (সোভিয়েত ইউনিয়ন) সর্বতোভাবে সহায়তা করেছে। আমি সেসব নাবিককেও দেখেছি, যারা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন অপসারণ করতে এসেছিলেন।

একই সংবাদমাধ্যমকে সিদ্ধিরগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবেক কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ গাঙ্গুলী বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ থেকে বৃত্তি পাওয়া যেসব শিক্ষার্থী লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলেন তাদের একটি বড় অংশকে এ কেন্দ্রে নিয়োগ দেয়া হয়। উচ্চমানের এ শিক্ষা ছিল বাংলাদেশীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়েও সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের পাশে থেকেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে দেশটি স্পষ্টভাবেই বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সে সময় পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিষয়টি অস্বীকার করে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। যুদ্ধকে দেখানো হচ্ছিল ভারত-পাকিস্তান সংঘাত হিসেবে। সে সময় ভারত যাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে না পারে, সে বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সম্মতি চাইছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সে সময় মিত্র ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অটল অবস্থান নেয় মস্কো। নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা পাকিস্তানের পরিকল্পনা পূরণ হয়নি।

এমনকি যুদ্ধের সময় বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর পাঁয়তারা করছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নও পাল্টা নৌবহর পাঠিয়ে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়।