নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ রুখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে চালু হয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। ফ্লাইট কম থাকায় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ক্ষেত্রবিশেষে টিকিটের মূল্য বেড়েছে অন্তত চার গুণ। অন্যদিকে বিদেশগামী প্রত্যেক যাত্রীর জন্যই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ, যার পেছনে যাত্রীপ্রতি খরচ হচ্ছে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে আগামী ১ আগস্ট থেকে যুক্ত হচ্ছে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ফি বাবদ আরো ১ হাজার ৭০০ টাকা (২০ ডলার)। সব মিলিয়ে বিদেশযাত্রায় প্রবাসী কর্মীদের ওপর পড়ছে বাড়তি খরচের চাপ।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করে দেশের ভেতরে বা বিদেশ গেলে যাত্রী নিরাপত্তা ও বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি দিতে হবে যাত্রীদের। ২২ জুলাই বেবিচক থেকে জারি করা এ-সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়েছে, বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে যাত্রী নিরাপত্তা ও সেবার মান বৃদ্ধি এবং বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে সব বহির্গামী যাত্রীদের এ ফি দিতে হবে।

দেশী ও বিদেশী সব এয়ারলাইনসকে পাঠানো ওই আদেশে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে যাত্রীদের প্রতিবার ভ্রমণে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি দিতে হবে ১০০ টাকা এবং যাত্রী নিরাপত্তা ফি দিতে হবে ৭০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি দিতে হবে ৫ ডলার এবং যাত্রী নিরাপত্তা ফি দিতে হবে ৬ ডলার। আর সার্কের সদস্য নয় এমন দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি দিতে হবে ১০ ডলার এবং যাত্রী নিরাপত্তা ফি দিতে হবে ১০ ডলার।

এর আগে সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী বিদেশগামী সব যাত্রীর কভিড-১৯ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়, যা গতকাল থেকে কার্যকর হয়েছে। বিদেশ গমনে কভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ নিতে যাত্রীদের ১৬টি নির্ধারিত পিসিআর ল্যাব থেকে নভেল করোনাভাইরাস পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। বিদেশগামী যাত্রীদের কভিড-১৯ পরীক্ষা সনদ প্রাপ্তির জন্য ল্যাবে গিয়ে নমুনা দেয়ার ক্ষেত্রে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহে ৪ হাজার ৫০০ টাকা ফি দিতে হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ নিতে যাত্রার ৭২ ঘণ্টার আগে যাত্রীর নমুনা সংগ্রহ করা হবে না এবং যাত্রার ২৪ ঘণ্টা আগে রিপোর্ট ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে হবে। নমুনা দেয়ার সময় পাসপোর্টসহ যাত্রীদের টিকিট ও পাসপোর্ট উপস্থাপন এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা একজন বিদেশগামী প্রবাসী কর্মীর জন্য ব্যয় ও পরিশ্রমসাপেক্ষ। আবার প্রবাসী অধ্যুষিত বেশির ভাগ জেলাতেই কভিড-১৯ পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। ফলে ঢাকার বাইরে কেবল সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর জেলায় সরকার নির্ধারিত পিসিআর ল্যাব থেকে করোনা পরীক্ষা করাতে হচ্ছে বিদেশগামীদের। ফলে অন্য জেলায় থাকা প্রবাসী কর্মীদের কভিড-১৯-এর সনদ জোগাড় করতে ঝামেলার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে ফ্লাইট কম থাকায় টিকিটের মূল্যও অতিরিক্ত নিচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো।

জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, যেসব প্রবাসী কর্মী ছুটি নিয়ে দেশে এসেছেন অর্থাৎ যাদের আকামার মেয়াদ আছে, বর্তমানে তারাই কেবল বিদেশে ফিরতে পারছেন। তা-ও সব দেশে নয়। তবে দীর্ঘদিন দেশে থাকায় তাদের হাতেও বেশি অর্থ নেই। এ অবস্থায় অতিরিক্ত মূল্যে টিকিট কেটে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়েছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনা পরীক্ষার খরচ ও বিমানবন্দরে নতুন করে আরোপিত ফি।

কভিড-১৯ মহামারীর কারণে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফিরছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। অন্যদিকে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার আগে যাদের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন ছিল, অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারাও। এরই মধ্যে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২ হাজার ৮১৬ জনের। আর বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলেও মেয়াদোত্তীর্ণের ঝুঁকিতে রয়েছে আরো ৮২ হাজার ৫৮৯টি শ্রম ভিসা।

এজেন্সিগুলো থেকে সর্বশেষ ১৪ জুলাই পর্যন্ত বায়রার সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩২০টি রিক্রুটিং এজেন্সির ৮৫ হাজার ৪০৫টি শ্রম ভিসার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে ২ হাজার ৮১৬টি ভিসা। এছাড়া ভিসা স্ট্যাম্পের জন্য অপেক্ষমাণ ৩০ হাজার ৪২২ জন, ভিসা স্ট্যাম্পিং সম্পন্ন ১৯ হাজার ১৯৮ জন, জনশক্তি ছাড়পত্র পেয়েছে ২২ হাজার ৯৮৭ জন, ফ্লাইট বাতিল ৩ হাজার ৭৪ জনের এবং অন্যান্য ৬ হাজার ৯০৪ জন।

এদিকে ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশী ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে দেড় থেকে দুই লাখ প্রবাসী শ্রমিক। তাদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ৪১ হাজার, আরব আমিরাত থেকে ৩৮ হাজার ও মালয়েশিয়া থেকে ১৯ হাজার ফিরে এসেছেন।

অন্যদিকে নভেল করোনাভাইরাস সংকটে নিয়মিত ফ্লাইট বন্ধ হলেও এপ্রিল থেকে নিয়মিতই বিশেষ ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী কর্মী ফিরে আসছেন। গত এপ্রিল, মে, জুন এবং চলতি জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিশেষ ফ্লাইটের মাধ্যমে সৌদি আরব বাদে ১৫টি দেশ থেকে অন্তত ২৭ হাজার বাংলাদেশী ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে আরব আমিরাত থেকে এসেছেন সাড়ে ছয় হাজার, যারা কাজ হারিয়েছেন। কুয়েত থেকে পাঁচ হাজার, যারা সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আসেন এবং মালদ্বীপ থেকে ৪ হাজার ২০০ ফিরে এসেছেন।

কেবল জুলাইয়েই সৌদি আরব থেকে ফাইনাল এক্সিট নিয়ে চূড়ান্তভাবে দেশে ফিরেছেন ৩ হাজার ৩২০ জন। এজন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সহায়তায় নিয়মিত বিশেষ ফ্লাইট আয়োজন করছে সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাস। কেবল জুলাইয়েই এ ধরনের আটটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করেছে বিমান।

তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ১৫টি দেশ থেকে প্রায় ২৬ হাজার প্রবাসীকর্মী ফেরত এসেছেন।