বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আধুনিক বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে বিপুলসংখ্যক দক্ষ বিজ্ঞানী ও পিএইচডিধারী গবেষক রয়েছেন। তাদের মেধা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সমস্যাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।
আজ রোববার ঢাকায় আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ড. আনোয়ার হোসেন অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘ (বায়েসা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা সমৃদ্ধিকরণে করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, পরমাণু প্রযুক্তি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ক্যান্সার চিকিৎসা, শিল্প ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করে স্টার্টআপ ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সহযোগিতা করা হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কারিগরি কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি চালু করা হবে। কোনো বিষয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না।
এসএমআর বা ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে এর নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যথাযথভাবে যাচাই করেই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তিনি বিজ্ঞান সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পারমাণবিক প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
মন্ত্রী আরো বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণাবান্ধব নীতির আওতায় পারমাণবিক বিজ্ঞানকে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক গবেষণার সঙ্গে সমন্বিত করে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, ফান্ড ফর ফান্ডস দিয়ে তরুণ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কিভাবে সহযোগিতা করা যায় সেটা আমরা ভাবছি।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সরকার চেষ্টা করছে কিভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ এর ঘাটতি মেটানোর সমাধান করা যায়। তিনি বলেন, আমরা সংকটের বিষয়টি অনুভব করছি এবং জ্বালানির টেকসই সমাধানের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং হয়ে গেছে। ওখানে প্রকৌশলীরা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ছোট-খাটো বিষয়গুলো এখন নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ নিউক্লিয়ার মেডিসিনের গুরুত্ব তুলে ধরে তারা বলেন, চিকিৎসাক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরো সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের সেবা চালু থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে এর সুফল আরো বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দিতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও সেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
উপদেষ্টা আরো বলেন, দেশের পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নির্ভর করবে দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। তাই বিজ্ঞানী ও গবেষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি তাদের ন্যায্য পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী, গবেষক ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন—দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মতবিনিময়ে সভায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিদ্যমান মেধা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও জনসেবার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন আরো বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দেশের অন্যতম বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ ঐতিহ্য ও বিপুলসংখ্যক দক্ষ বিজ্ঞানী ও গবেষক থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও অপ্টিমাইজেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কমিশনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
সচিব বলেন, পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি এসএমআর, নিউক্লিয়ার মেডিসিন, কৃষি, শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কমিশনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা বাড়িয়ে গবেষণার ফলাফলকে বাস্তব প্রয়োগ ও বাজারমুখী উদ্ভাবনে রূপ দিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগকে বিদেশ ভ্রমণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মূলত মানবসম্পদ ও জ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতা উন্নয়নের বিনিয়োগ। সরকার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে দ্রুত বিবেচনা করা হবে।
জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামো প্রসঙ্গে সচিব বলেন, কমিশনের প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি, অর্গানোগ্রাম হালনাগাদ এবং পদোন্নতিসহ অন্যান্য যৌক্তিক বিষয় সরকারি বিধি ও জাতীয় নীতিমালার আলোকে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে কমিশনের সেবার পরিধি আরো বিস্তৃত করে দেশের অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও অন্যান্য সেবা পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, জাতীয় জীবপ্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বিত গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। এতে গবেষণার পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
বিজ্ঞান সচিব আরো বলেন, তরুণ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সামনে রেখে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে দক্ষ মানবসম্পদের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি কার্যকর মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গবেষণা পাইপলাইন গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক ও বর্তমান বিজ্ঞানী, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শমূলক কাঠামো গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সচিব বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু গবেষণা পরিচালনা নয়; গবেষণার ফলাফলকে জাতীয় উন্নয়ন, শিল্পায়ন, জনসেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে গবেষণা থেকে বাস্তব প্রয়োগ এবং প্রয়োগ থেকে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরির পথ আরো সুগম করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে সম্ভাবনার বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে আরো শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা ও সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।
‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা সমৃদ্ধকরণ: বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এইআরইয়ের মহাপরিচালক এবং বায়েসার সভাপতি ড. এ এস এম সাইফুল্লাহ।
মতবিনিময় সভায় আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মঈনুল ইসলাম, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড.সারোয়ার হোসেন, সদস্য(পরিকল্পনা) মো. হাসিনুর রহমান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আলী জুলকারনাইন, বাপশকের সাবেক পরিচালক ডা.ফারিয়া নাসরিন।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের (বায়েসা) সাধারণ সম্পাদক এবং পরিচালক ড. মোঃ গোলাম রসুল।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা ও মুখপত্র 'অন্বেষা' এর মোড়ক উন্মোচন করেন।
মতবিনিময় সভায় রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড.হুমায়ুন কবীর, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালকরা, সংস্থাটির বিভিন্ন পর্যায়ের বিজ্ঞানীসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।










